ফিঙ্গারপ্রিন্ট (আঙুলের ছাপের) আবিষ্কারক একজন বাঙালি

বাঙালির চুরি হয়ে যাওয়া কৃতিত্ব: আখতার হুসেন

অপরাধী শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথা আঙুলের ছাপের আবিষ্কারক একজন বাঙালি, কিন্তু সেই আবিষ্কার চুরি করে নেয় তাঁরই ইংরেজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কিন্তু সেই চুরির ঘটনা গোপন থাকেনি। ১০০ বছর পর মুখ খুলেছে ইতিহাস: আঙুলের ছাপের আবিষ্কারক আসলে খুলনার একজন বাঙালি, নাম কাজি আজিজুুল হক। এটা সেই বিস্মৃত মুসলমান বাঙালিরই বিরল আখ্যান

ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা হাতের আঙুলের ছাপের ব্যবহার নিয়ে খ্রিষ্টপূর্বকালে বিশ্বের দেশে দেশে কত বিচিত্র প্রকৃতির কাজই না হয়েছে! তার বিবরণ তুলে ধরার অবকাশ এই নিবন্ধে নেই। আমরা বরং অপরাধী শনাক্ত করার কাজে আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে ঊনবিংশ শতকের শেষপাদ থেকে শুরু হওয়া এবং বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত চলতে থাকা গবেষণার ফিরিস্তিতে চলে আসি। তাহলেই আমরা পেয়ে যাব সেই বিস্মৃত বাঙালি আজিজুল হককে এবং দেখব তাঁর গবেষণাগত কাজের মূল্য কত গভীর ও অপরিসীম! শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতি বহু বাধা-বিপত্তি উজিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তাঁকে বাদ দিয়ে অপরাধী শনাক্তকরণে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথা আঙুলের ছাপের ইতিহাস হতে পারে না। অথচ তাঁর এই কৃতিত্বই অনেক কিছুর মতো চুরি করে নেয় ব্রিটিশরাজের একজন শীর্ষচূড় কর্মকর্তা, কিন্তু ইতিহাসের বিচার তাঁর প্রাপ্য তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে। শোনা যাক সেই বিস্মৃত মুসলমান বাঙালির বিরল আখ্যান।

কে এই আজিজুল হক?
তাঁর পারিবারিক নাম কাজি সৈয়দ আজিজুল হক। তিনি জন্মেছিলেন ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে তখনকার খুলনা জেলার ফুলতলার পাইগ্রাম কসবায়। বয়সে তিনি যখন একেবারে তরুণ, তখন তাঁর মা-বাবা মারা যান এক নৌ-দুর্ঘটনায়। ১২ বছর বয়সে তিনি বাড়ি ছেড়ে পালান। বহু পথ পাড়ি দিয়ে পা রাখেন কলকাতা মহানগরের মাটিতে। ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত আজিজুল হক একটা বাড়ির সামনে এসে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমন্ত কিশোরটিকে বাড়ির অভিভাবকের ভালো লাগে। তিনি তাঁকে লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। গণিতে আজিজুলের মাথা খুবই ভালো ছিল। হাইপেরিয়ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত ফিঙ্গারপ্রিন্টস বইয়ের লেখক ও গবেষক কলিন বিভানের মতে, আজিজুল হক যখন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র, তখন তাঁকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথা আঙুলের ছাপসংক্রান্ত একটা প্রকল্পে কাজ করার জন্য মনোনীত করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষই তাঁকে মনোনীত করেন। ব্রিটিশরাজের অধীন বাংলার পুলিশ বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল তখন স্যার অ্যাডওয়ার্ড হেনরি। তাঁর নেতৃত্বেই চলছিল এই প্রকল্পের কাজ। গণিত ও পরিসংখ্যানে মাথা ভালো, এমন কাউকে তিনি খুঁজছিলেন। ফলে কলেজের অধ্যক্ষ আজিজুল হককেই এ কাজের জন্য বেছে নেন। অধ্যক্ষের সুপারিশে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে হেনরি তাঁকে তাঁর প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ করে দেন। সালটা ১৮৯২।
কাজ শুরু হলো কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। অখণ্ড বাংলায় তখন অ্যানথ্রোপমেট্রি (মানবদেহের আকৃতি) পদ্ধতিতে অপরাধীদের শনাক্ত করার কাজ চলত। অ্যাডওয়ার্ড হেনরি এই পদ্ধতিতে বেশ ত্রুটি খুঁজে পেলেন। দেখলেন, একজন লোকের দেহের মাপ বিভিন্ন হাতে এক ধরনের থাকে না। ১৮৯৩ সালের ৩ জানুয়ারি তাই তিনি এক পরওয়ানা বলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত লোকজনের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের টিপ নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এর তিন বছর পর তিনি ধরা পড়া প্রত্যেক অপরাধীর দুই হাতের ১০ আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল আঙুলের ছাপ নেওয়া এসব কাগজপত্র ফাইলভুক্ত করা নিয়ে। এই কাজে এগিয়ে এলেন গণিতের ছাত্র এবং সদ্য সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকরি পাওয়া আজিজুল হক। অক্লান্ত চেষ্টার ফলে তিনি যে পদ্ধতি উদ্ভাবন বা আবিষ্কার করলেন, তা-ই ‘হেনরি সিস্টেম’ বা ‘হেনরি পদ্ধতি’ নামে পরিচিত হলো। অ্যাডওয়ার্ড হেনরি নিজের নামেই তা চালিয়ে দিলেন। কিন্তু এই হেনরি রহস্যের জট খুলতে লেগে গেছে ১০০ বছর। অবশ্য তাঁর কাজের পুরস্কার হিসেবে আজিজুল হককে দেওয়া হয়েছিল ‘খান বাহাদুর উপাধি’, পাঁচ হাজার টাকা এবং ছোটখাটো একটা জায়গির। চাকরিতে পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন পুলিশের এসপি। অবিভক্ত ভারতের চম্পারানে (বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের একটি জেলা যা উত্তর চম্পারান নামে পরিচিত) কাটে তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো। সেখানেই তিনি ১৯৩৫ সালে মারা যান। বিহারের মতিহারি স্টেশনের অনতিদূরে তাঁর নিজের বাড়ি ‘আজিজ মঞ্জিল’-এর সীমানার মধ্যে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে চলে আসেন। মরহুম আজিজুল হকের পুত্র আসিরুল হক পুলিশ বিভাগের ডিএসপি হয়েছিলেন। তাঁর দুই বিখ্যাত নাতি ও নাতনি হচ্ছেন যথাক্রমে ইতিহাসের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং শহীদ জায়া বেগম মুশতারী শফী। এছাড়াও তাঁর আরো আত্মীয়স্বজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে।

আজিজুল হকের মৌলিকত্ব কোথায়?
২০০১ সালে প্রকাশিত কলিন বিভান তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্টস গ্রন্থে আজিজুল হকের গবেষণার মৌলিকত্ব সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন, অ্যানথ্রোপমেট্রিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আজিজুল হক ভয়ানক অসুবিধার সম্মুখীন হন। ফলে নিজেই হাতের ছাপ তথা ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণীবিন্যাসকরণের একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন করে সে অনুযায়ী কাজ করতে থাকেন। তিনি উদ্ভাবন করেন একটা গাণিতিক ফর্মুলা। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ৩২টি থাক বানান। সেই থাকের ৩২টি সারিতে সৃষ্টি করেন এক হাজার ২৪টি খোপ। বিভান আরও জানাচ্ছেন, ১৮৯৭ সাল নাগাদ হক তাঁর কর্মস্থলে সাত হাজার ফিঙ্গারপ্রিন্টের বিশাল এক সংগ্রহ গড়ে তোলেন। তাঁর সহজ-সরল এই পদ্ধতি ফিঙ্গারপ্রিন্টের সংখ্যায় তা লাখ লাখ হলেও শ্রেণীবিন্যাস করার কাজ সহজ করে দেয়।
এর আগে বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস গ্যালটন, যে একইসঙ্গে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউনের চাচাত ভাই, তাঁর উদ্ভাবিত অ্যানথ্রোপমেট্রিক পদ্ধতি অপরাধী শণাক্তকরণের কাজে ব্যবহার হয়ে আসছিল, কিন্তু এই পদ্ধতিতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণীবিন্যাসকরণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যেত, অথচ হকের সাব-ক্ল্যাসিফিকেশন পদ্ধতি বা শ্রেণীবিন্যাসকরণ পদ্ধতির দৌলতে তা হয়ে দাঁড়ায় বেশি হলে মাত্র এক ঘণ্টার কাজ। অথচ আজিজুল হকের এই পুরো কৃতিত্ব অ্যাডওয়ার্ড হেনরি নিজের বলে চালিয়ে দেন। তাঁর এই পদ্ধতির নাম দেন ‘হেনরি সিস্টেম’। এমনকি তিনি ক্ল্যাসিফিকেশন অ্যান্ড ইউজেস অব ফিঙ্গারপ্রিন্টস নামে যে বই লেখেন, তাতেও বেমালুম চেপে যান আজিজুল হকের নাম। এবং ব্রিটিশ সরকারও যথারীতি স্বীকৃতি দিলেন এই পদ্ধতিকে। এর অল্প দিনের মধ্যেই কলকাতায় স্থাপন করা হলো বিশ্বের প্রথম ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো’। এই সংস্থা গড়ে তোলার বেশ পরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে একই ধরনের আরও একটি ব্যুরো গড়ে তোলা হয়। আমেরিকাতেও গড়ে ওঠে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান। তবে বেশ পরে। আর আজ বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যুরো বা সংস্থা গড়ে ওঠেনি, যেখানে অনুসৃত হয় না আজিজুল হক উদ্ভাবিত ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের শ্রেণীবিন্যাসকরণ পদ্ধতি।

গোপন আর গোপন থাকেনি
কারেন্ট সায়েন্স সাময়িকীর ২০০৫ সালের ১০ জানুয়ারি সংখ্যায় জিএস সোধী ও যশজিৎ কাউর ‘দ্য ফরগটেন ইন্ডিয়ান পাইওনিয়ারস অব ফিঙ্গারপ্রিন্ট সায়েন্স’ শীর্ষক যে দীর্ঘ নিবন্ধ লেখেন, তাতে তাঁরা হাতের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্টের শ্রেণীবিন্যাসকরণের ক্ষেত্রে খান বাহাদুর আজিজুল হকের অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করে বলেছেন, এ ক্ষেত্রে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। শুধু তা-ই নয়, তাঁরা স্যার অ্যাডওয়ার্ড হেনরির মুখোশ উন্মোচন করতেও দ্বিধা করেননি। তাঁদের দুজনের লেখা ওই নিবন্ধ থেকে এও জানা যাচ্ছে যে আজিজুল হক তাঁর কাজের স্বীকৃতি চেয়ে আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আবেদন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। বিশেষত অ্যাডওয়ার্ড হেনরি যত দিন কর্মসূত্রে ভারতে ছিলেন, তত দিন এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করার কোনো ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু হেনরির বিবেকের জ্বালা বোধ হয় ছিল। সেই জ্বালা বা যন্ত্রণা থেকেই তিনি ১৯২৬ সালের ১০ মে ইন্ডিয়া অফিসের তখনকার সেক্রেটারি জেনারেলকে এক চিঠি মারফত জানাচ্ছেন, ‘আমি এটা পরিষ্কার করতে চাই যে আমার মতে, শ্রেণীবিন্যাসকরণ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) পদ্ধতিকে নিখুঁত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন আমার কর্মচারীদের মধ্যে তিনি (আজিজুল হক)। সময়ের পরীক্ষায় সেই পদ্ধতি উত্তীর্ণ হয়েছে এবং বেশির ভাগ দেশ তা গ্রহণ করেছে।’ প্রশ্ন উঠতে পারে কেন ৩০ বছর পর আজিজুল হকের অবদানের স্বীকৃতি দিলেন তিনি? এত দিন কেন দেননি? জবাবে বলা হচ্ছে, প্রথমত, হকের পদোন্নতি। এবং দ্বিতীয়ত, ভারতীয় জনগণের ওপর তত দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রভাব খর্ব হওয়ার বিষয়টি। যদি হেনরির গোপনীয়তা হক বা তাঁর অন্য সহকর্মীরা ফাঁস করে দেন! সম্ভবত এই ভয় থেকেই আজিজুল হকের অবদানের কথা বেমালুম চেপে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

শেষ খবর
এখন দিবালোকের মতো এটা স্পষ্ট যে কথিত ‘হেনরি সিস্টেম’ আর হেনরির নয়। এখন আজিজুল হকের ভক্ত ও অনুসারীরা ফিঙ্গারপ্রিন্টের এই পদ্ধতিকে ‘হেনরি-হক-বোস সিস্টেম’ বলে অভিহিত করছেন। উল্লেখ্য, হেমচন্দ্র বোস ছিলেন আজিজুল হকের সহকর্মী। এ ক্ষেত্রে তাঁরও অবদান কম নয়। আমেরিকার সেন্ট লুইসে বসবাসকারী আজিজুল হকের প্রপিতামহ ব্রিট ফেন্সি নামে আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বোসের ওপর কাজ করে যাচ্ছেন। ব্রিটেনের ‘দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি’ ফেন্সির উদ্যোগে চালু করেছে ‘দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি আজিজুল হক অ্যান্ড হেমচন্দ্র বোস প্রাইজ’। যাঁরা ফরেনসিক সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সবিশেষ অবদান রাখবেন, এ পুরস্কার দেওয়া হবে তাঁদেরই।