বাংলাদেশ পানি আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

ঢাকা, মে ২১ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)

পানির অপচয় রোধে মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং ব্যবহারের শর্ত ভাঙলে কারাদণ্ডের বিধান রেখে বাংলাদেশ পানি আইনের খসড়া নীতিগত অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত (ভেটিং) নিয়ে আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবার মন্ত্রিসভায় তোলা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূইঞা।

খসড়া প্রস্তাবে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে যে কোনো উৎস থেকে পাওয়া পানি মৌলিক চাহিদার বাইরে যথেচ্ছ ব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অপরাধের জন্য কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে।

এতে যে কোনো উৎস থেকে ব্যক্তিগত ব্যবহার ও সেচসহ মৌলিক চাহিদার অতিরিক্ত পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল্য আরোপের বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনের পর ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট মন্ত্রিসভায় পানি আইনের খসড়াটি উত্থাপিত হয়। কিন্তু মন্ত্রিসভা খসড়াটি আরো সংশোধনের জন্য তা ফেরৎ পাঠায়।

১৯৯৯ সালে প্রণীত পানি-নীতির আলোকে পানি আইন প্রণয়ন হচ্ছে।

“এতে দেশের বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া পানির অপব্যবহার রোধ হবে। সাধারণ মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে,” বলেন সচিব।

তিনি বলেন, দেশে পানি আইন না থাকায় ভূ-গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। দিন দিন ভূ-উপরিস্থ ও ভূ-গর্ভস্থ পানি কমছে।

“এটা আমাদের জন্য বিপদ সঙ্কেত। পানির স্তর নিচে নামলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ে,” বলেন তিনি।

যা রয়েছে প্রস্তাবিত পানি আইনে

আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, পানির অপচয় ও অপব্যবহার রোধ করে সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার পানি ব্যবহার মূল্য নীতিমালা প্রণয়ন করবে।

মূল্য আরোপ নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়, গৃহস্থালি ও সাধারণ কৃষি কাজে ব্যবহারের পানির জন্য কোনো মূল্য দিতে হবে না। পানির চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে মূল্যনীতি প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে।

এ নীতিতে দরিদ্র এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ব্যবহারের পানির মূল্য যুক্তিসঙ্গতভাবে কম রাখার বলা হয়েছে। পানি সরবরাহকারী ও সেবাভোগী জনসংখ্যার প্রয়োজনীয়তা ও সামর্থ্যরে সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পানির মূল্য কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।

মৌলিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম মূল্য এবং বাণিজ্যিক ও শিল্পখাতে ব্যবহারের জন্য বেশি মূল্য ধরা হবে। এক্ষেত্রে কোনো সরকারি বা বেসরকারি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহ করা পানির সেবা মূল্য নিজ নিজ সংস্থা নির্ধারণ করবে। সেচ প্রকল্পে পানির কর বা সেবা মূল্য বর্তমান আইন অনুযায়ী আদায় করা হবে।

পানির মূল্য সম্পর্কে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, পানি ব্যবহারের কোনো আইন না থাকায় ইচ্ছেমতো পানি ব্যবহার হচ্ছে। প্রচুর পানির অপচয় হচ্ছে।

“পানির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে আইনে পানির মূল্য নির্ধারণ করার বিষয়টি রাখা হয়েছে। তবে মৌলিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ মূল্য প্রযোজ্য হবে না।”

ইতোমধ্যে বেশকিছু ক্ষেত্রে পানির মূল্য নির্ধারিত থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই এখনো পানির মূল্য নির্ধারিত নেই। যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে এসব ক্ষেত্রেও পানির মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

পানি দূষণ রোধ এবং জলাধার, নদ-নদী ও খাল ভরাট করে পানির উৎস সঙ্কুচিত করা ঠেকাতে নতুন আইনে পানি সম্পর্কিত বিশেষ আদালত (ট্রাইব্যুনাল) করার কথা বলা হয়েছে।

আদালতই পানির অপচয় ও অপব্যবহারের ক্ষতি নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করবে, বলেন ওয়ারপোর সাবেক মহাপরিচালক।

পানির সঙ্কটপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার বিষয়েও আইনের খসড়ায় সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের অনেক জায়গায় গ্রীষ্ম মৌসুমে খাওয়ার পানির ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দেয়। এসব এলাকায় ক্রমেই ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

“তাই পানি সঙ্কটপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এসব এলাকায় পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার,” বলা হয় খসড়া আইনে।

আইন লঙ্ঘনের শাস্তি

কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নলকূপ ব্যবহার করে ভূ-গর্ভস্থ পানি সরবরাহ করা, বেআইনি ক্ষমতা প্রয়োগ বা আইন লঙ্ঘন করে পানিসম্পদের ক্ষতি করা, পানি বা পানির অধিকার অননুমোদিত বিক্রি, ইজারা অথবা হস্তান্তর করা, অনুমোদিত ক্ষেত্র ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে পানি ব্যবহার, বিদ্যমান আইনে পানি ব্যবহারে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হওয়া, সরকারি আদেশ, আইন বা বিধি লঙ্ঘন, উন্মুক্ত খাল-নালা বা আধারে অবৈধভাবে পানি গ্রহণ অথবা ভিন্নমুখী করা, প্রাকৃতিক জলাধারে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মৎস্য বা জলজ প্রাণী ও নৌচলাচলে বাধা দেওয়া, পানিসম্পদের অবৈধ দখল বা দূষণ করা, পানি ব্যবহারের শর্ত না মানা, বেআইনিভাবে ও ইচ্ছাকৃত পানির কার্যক্রমে অন্যায় হস্তক্ষেপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এছাড়া পানি সংক্রান্ত বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেওয়াকে প্রস্তাবিত আইনে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে।

পানি আইন লঙ্ঘণের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে অনুমোদিত আইনের খসড়ায়।

বিশেষ ক্ষমতা ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রোসিডিউর, ১৮৯৮’-এ ভিন্নতর যা কিছুই থাকুক না কেন, একজন প্রথম শ্রেণীর বিচারিক হাকিম বা মহানগর হাকিম (মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) এ আইনে কোনো ব্যক্তির অর্থদণ্ড করতে পারবেন।

আইন বাস্তবায়নের বিশেষ প্রয়োজনে কিছু অপরাধের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

পানি, পানিসম্পদ অথবা জলজ প্রাণী বা প্রকৃতির কোনো ক্ষতির জন্য ক্ষতির মূল্যায়ন করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ আদায় করা যাবে। এক্ষেত্রে আদালতই ক্ষতির মূল্যায়ন করবে।

আইন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদ সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ হিসেবে কাজ করবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়। পানিসম্পদমন্ত্রীর নেতৃত্ব গঠিত পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটি এ জাতীয় পরিষদকে সহায়তা করবে।

অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা

এক বা একাধিক প্রধান নদীর আওতাধীন পানি উন্নয়নে অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা খসড়ায় বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বন্যা, খরা ও পানি দূষণে আকস্মিক যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় এবং পানিসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নদ-নদীর উন্নয়ন

নদ-নদীর নাব্যতা বজায় রাখার জন্য খনন কাজ চালানোর কথা বলা হয়েছে এ আইনে।

এতে বলা হয়েছে, একাধিক শাখায় প্রবাহিত নদীর কোনো শাখা যেন বন্ধ না হয় তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। ভরাট করে নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না।

নদীর তীরবর্তী সীমানা অতিক্রম করে স্থাপনা বা ভবন তৈরির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে এতে।

খসড়া প্রস্তাবের পূর্বপ্রক্রিয়া

জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রকল্পের (১৯৯৯-২০০১) অধীনে ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে পানি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। খসড়াটি একাধিকবার পরিমার্জন ও সংশোধনের পর ২০১০ সালে আরেকটি খসড়া তৈরি করা হয়।

২০১১ সালের জানুয়ারিতে আবার পরিমার্জন করে একই বছরের ২২ মে খসড়াটি জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়। গত বছরের ১৪ আগস্ট মন্ত্রিসভায় খসড়াটি উত্থাপিত হলে মন্ত্রিসভা আবারো এটি ফেরৎ পাঠায়।