মন্ত্রীর অনুষ্ঠান তাই ৩২৩ বিদ্যালয়ে ছুটি!

প্রথম আলো প্রতিবেদক, বরগুনা | তারিখ: ৩০-০৫-২০১২

প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ‘অলিখিত নির্দেশ’ থাকায় বরগুনার তিনটি উপজেলার ৩২৩টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত এক হাজার ৪৬৩ জন শিক্ষক একযোগে আজ বুধবার সংরক্ষিত ছুটি নিয়েছেন। আর সংশ্লিষ্ট সব বিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
মন্ত্রী আফছারুল আমীন আজ ৩০ মে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় আসছেন। এখানে তিনি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন।
অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে যোগদানের বিষয়ে বরগুনার পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নির্দেশ রয়েছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই শিক্ষকেরা ছুটি নেওয়া ও বিদ্যালয় বন্ধ রাখার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তো চাকরি করি। তাই সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আমাদের চলতে হয়।

কিন্তু চাকরিজীবনে এমন নজির কোনো দিন দেখিনি।’ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরগুনা জেলা সভাপতি রাজিয়া বেগম এ বিষয়ে বলেন, ‘সংরক্ষিত ছুটি নেওয়াটা বৈধ অধিকার। কিন্তু তার উপলক্ষ এমন হওয়াটা নৈতিকতার মধ্যে পড়ে বলে মনে হয় না, যা প্রশ্নবিদ্ধ তা কখনো সুন্দর ও নৈতিক হতে পারে না।’
তিন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ বিকেল তিনটায় পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদ মাঠে ‘মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে মন্ত্রী আফছারুল আমীন প্রধান অতিথি। সভায় বাধ্যতামূলকভাবে যোগ দিতে তিন উপজেলার সব সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অলিখিত নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা। ফলে বেতাগী উপজেলার ১২৩টি বিদ্যালয়ের ৫৯৩ জন শিক্ষক, পাথরঘাটা উপজেলার ১৪২টি বিদ্যালয়ের ৬২০ জন শিক্ষক এবং বামনা উপজেলার ৫৭টি বিদ্যালয়ের ২৫০ জন শিক্ষককে সংরক্ষিত ছুটি নিতে হয়েছে। তাঁরা একযোগে ছুটি নেওয়ায় বিদ্যালয়গুলো আজ বন্ধ থাকবে।
পাথরঘাটা উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. সগির হোসেন বলেন, ‘আমাদের মাসিক সভায় উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা মন্ত্রী মহোদয়ের মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমিতির আরেক নেতা জানান, অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহে শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদাও নিয়েছেন শিক্ষা কর্মকর্তা।
পাথরঘাটা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছুটির বিষয়টি স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন ও মতবিনিময় সভা উপলক্ষে বিদ্যালয়গুলোতে সংরক্ষিত ছুটি দিয়ে বন্ধ রাখতে বলেছি।’ অনুষ্ঠান বিকেল তিনটায়, তাহলে পুরো দিন বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশ কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দূরের বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যাতে সময়মতো সভায় যোগ দিতে পারেন, সে জন্য এটা করা হয়েছে।’
বেতাগী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সূত্র জানায়, মন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গত শনিবার বিকেলে বেতাগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলনায়তনে এক প্রস্তুতি সভা হয়। সভায় মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাধ্যতামূলকভাবে যোগদানের সিদ্ধান্ত ছাড়াও শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা চাঁদা ধার্য হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সেলিম আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা সংরক্ষিত ছুটি নিয়ে লঞ্চযোগে মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাথরঘাটায় যাব।’
বেতাগী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইলিয়াস আহম্মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বিভাগীয় মন্ত্রী আসবেন, তাই সেখানে যোগ দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এ জন্য আমি তাঁদের (শিক্ষক) বলেছি, আপনাদের যাওয়া উচিত। তবে কোনো ধরনের চাপ বা নির্দেশ দেওয়া হয়নি।’ এটা নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ রকম অনেক নজির আছে।’
বামনা উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. শাহজাহান বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়ের নির্দেশে আমরা বিদ্যালয় বন্ধ রেখে মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ জন্য শিক্ষকেরা সংরক্ষিত ছুটি নিয়েছেন। তবে আমরা কোনো চাঁদা তুলিনি।’
তবে বিদ্যালয় বন্ধ রাখার নির্দেশের বিষয়টি অস্বীকার করে বামনা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি শিক্ষকদের ১২টা পর্যন্ত ক্লাস নিয়ে তারপর মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলেছি।’
এ ব্যাপারে বরগুনা-২ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ গোলাম সবুর বলেন, ‘আমি বিদ্যালয়গুলো বন্ধ করার কোনো নির্দেশনা দিইনি। এটা সরকারি কর্মসূচি। সরকারি কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।’