কত টাকা! কালো টাকা!!

সরকারি হিসাবে আরও বেশি
প্রথম আলো জুন ৩

বাংলাদেশে কালোটাকার হার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৭ শতাংশ। এই হিসাবে কালোটাকার পরিমাণ হয় প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
অস্ট্রিয়ায় জোহানস কেপলার ইউনিভার্সিটি অব লিনজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নাইডারের গবেষণায় বাংলাদেশের কালোটাকার এই পরিমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘বিশ্বব্যাপী ছায়া অর্থনীতি: ১৬২টি দেশের নতুন হিসাব’ নামের এই গবেষণা গত বছর প্রকাশিত হয়। অধ্যাপক স্নাইডার ২০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কালোটাকা নিয়ে কাজ করছেন। এটাকেই কালোটাকা নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গবেষণা ধরা হয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের কালোটাকার হার ৩৭ শতাংশ হলেও নিজস্ব হিসাবে এর পরিমাণ আরও বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কালোটাকা জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮১ শতাংশ। এই হিসাবে বাংলাদেশের কালোটাকার পরিমাণ সর্বনিম্ন এক লাখ ৭৭ হাজার ৪৭ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ তিন লাখ ১০ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
‘বাংলাদেশের অপ্রকাশ্য অর্থনীতির আকার: একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময় জমির অতি উচ্চমূল্য এবং শেয়ারবাজারের তেজিভাবের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কালোটাকার যোগসূত্র রয়েছে। এ ছাড়া, কালোটাকা বাড়ায় কিছু ব্যক্তির কাছে সম্পদ ঘনীভূত হচ্ছে। এতে সমাজে জীবনযাত্রার মানেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি অনানুষ্ঠানিক অর্থের মালিক জর্জিয়া। জর্জিয়ায় কালোটাকা দেশটির জিডিপির ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। এর পরের অবস্থান বলিভিয়ার, ৭০ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে সুইজারল্যান্ড, দেশটির অনানুষ্ঠানিক বা ছায়া অর্থনীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের কালোটাকা ২৩ শতাংশ, ভুটানের ৩১ দশমিক ১ শতাংশ, মালদ্বীপের কালোটাকা ৩২ দশমিক ১ শতাংশ, নেপালের কালোটাকা সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের কালোটাকার হার ৪০ দশমিক ১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে শ্রীলঙ্কা, ৪৭ শতাংশ।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের কালোটাকা ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, ২০০০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০১ সালে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০০২ সালে সাড়ে ৩৫ শতাংশ, ২০০৩ সালে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০৪ সালে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৩৬ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ৩৭ শতাংশ। অধ্যাপক স্নাইডারের গবেষণায় সবগুলো দেশের ক্ষেত্রেই সর্বশেষ ২০০৭ সালের তথ্য রয়েছে।

 

আসছে টাকা সাদা করার মহোৎসব

আবারও ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আসছে। আগামী ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটে এই ঘোষণা দেওয়া হবে।
এক বছরের জন্য বিনা প্রশ্নে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইভাবে শেয়ারবাজারে এই সুবিধা বহাল থাকবে।
তবে কালোটাকা সাদার করার জন্য জরিমানার বিধান থাকছে। এনবিআরের আয়কর বিভাগের একদল কর্মকর্তা করহার ও জরিমানা নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তবে অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ মহল এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই বিষয়ে রাজনীতিকেরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’ এর বেশি তিনি আর কিছু বলেননি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এক বছর আগের উপার্জিত টাকা সাদা করতে হলে ১০ শতাংশ, দুই বছর আগে উপার্জিত টাকা সাদা করতে বছরপ্রতি ১০ শতাংশসহ মোট ২০ শতাংশ এবং তিন বছর আগে উপার্জিত অর্থ সাদা করলে বছরপ্রতি ১০ শতাংশ জরিমানাসহ মোট ৩০ শতাংশ হারে জরিমানা নির্ধারণ করা হবে।
যে বছর অবৈধ অর্থ উপার্জিত হয়েছে, সেই বছরের কর হার অনুযায়ী করও দিতে হবে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২৮ ধারা সংশোধন করে এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
যাঁরা কালো টাকা সাদা করবেন, তাঁরা শুধু এনবিআরের নির্ধারিত ফরম পূরণ করে জরিমানার অর্থ জমা দেবেন। পরের বছরের বার্ষিক আয়কর বিবরণী দাখিলের সময় ওই করদাতা তা উল্লেখ করলেই হবে। আয়কর অধ্যাদেশে কালো টাকা আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে রাজনৈতিক সমঝোতা বলা হয়। কিন্তু আমি “রাজ” শব্দটি বাদ দিয়ে “নৈতিক” অবস্থানে থাকতে চাই।’
আজিজুল ইসলামের মতে, কালোটাকা সাদা করার সুযোগে তিনটি বিষয় থাকে। প্রথমত, এ ধরনের সুযোগ কখনোই খুব একটা কাজে আসেনি। দ্বিতীয়ত, এতে সৎ করদাতাদের বঞ্চিত করা হয়। তৃতীয়ত, এতে কালোটাকা উপার্জনে উৎসাহিত করা হয়। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, সরকারের উচিত কালোটাকা উপার্জনের উৎসগুলো বন্ধ করা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের চাপে আবারও ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন মহল মনে করে, নতুন অনুমোদন দেওয়া ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সুবিধা দিতেই এই সুবিধা রাখা হচ্ছে।
জানা গেছে, আয়কর অধ্যাদেশের কিছুটা পরিবর্তন করেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো করদাতার ফাঁকি দেওয়া অর্থ বা গোপন করা আয় শুধু ধরা পড়লেই জরিমানাসহ তা বৈধ করার সুযোগ ছিল। নিয়মানুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি পাঁচ বছর আগে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে ঘোষণা না দিয়ে গোপন করেন এবং সেই গোপন করা অর্থ যদি কর কর্মকর্তারা চিহ্নিত করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে পাঁচ বছর আগের কর হারের সঙ্গে প্রতিবছরের জন্য ১০ শতাংশ করে জরিমানা দিয়ে সমপরিমান অর্থ বৈধ করতে পারবেন।
এনবিআর এখন আয়কর অধ্যাদেশের ১২৮ নম্বর ধারাটি সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধন অনুযায়ী, এখন আর কর কর্মকর্তাকে কর ফাঁকি চিহ্নিত করতে হবে না। যে কেউ এই ধারার সুযোগ নিয়ে শুধু জরিমানা দিয়ে কালোটাকা সাদা করতে পারবেন। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, এটা একধরনের আমন্ত্রণ জানিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ।
স্বাধীনতার পর প্রতিটি সরকার এসেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু খুব একটা কাজ হয়নি, খুব বেশি কালোটাকা সাদাও হয়নি। এ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা সাদা হয়েছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত তিন বাজেটেই বিভিন্ন উপায়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে ৯২৩ কোটি কালোটাকা সাদা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা সাদার সুযোগ ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। তবে এটি অব্যাহত থাকছে।