রাজনীতি, দুর্নীতি, মিডিয়া

প্রথম আলো, তারিখ: ০২-০৬-২০১২

রাজনীতিতে সারা দেশ বিভক্ত হয়ে পড়েছে

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলী খান বলেছেন, আজকে আমাদের দেশ সর্বত্র বিভক্ত হয়ে গেছে। সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক, চিকিত্সকই হোক, সরকারি কর্মচারিই হোক আর সাংবাদিকেরাই হোক—রাজনীতিতে সারা দেশ বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
আজ শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে দৈনিক সূর্যোদয় নামের একটি নতুন জাতীয় দৈনিকের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে আকবর আলী খান এ কথা বলেন।
আকবর আলী খান বলেন, ‘আজকে যে শিশু জন্মগ্রহণ করল সে কেমন সময়ে জন্মগ্রহণ করল?—এই সমটাকে যদি ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে আমি চার্লস ডিকেন্সের ভাষায় বলব, কাগজটি জন্মগ্রহণ করেছে এমন এক মুহূর্তে যেটি ‘বেস্ট অব টাইম’ এবং ‘ওরস্ট অব টাইম’।’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এটি ভালো সময়। কারণ ৪০ বছর আগে যে দেশটি যখন জন্মগ্রহণ করেছিল তখন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, যে এ রাষ্ট্রটি মুখ থুবড়ে পড়বে। ৪০ বছরে সেটাকে আমরা মিথ্যা প্রমাণ করেছি। বাংলাদেশের মানুষের সৃজনশীলতা আজ শতদলের মত বিকশিত। তিনি কৃষি, তৈরি পোশাক শ্রমিকদের অর্জন তুলে ধরে বলেন, ‘এই যে সৃজনশীলতার বিকাশ, এটা একটা জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।’ অতএব সূর্যদয় পত্রিকা এমন সময় জন্মগ্রহণ করছে অত্যন্ত সুসময়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই সাবেক উপদেষ্টা বলেন একদিক থেকে অত্যন্ত দুঃসময় বটে। দুঃসময় এ কারণে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ শতকরা নব্বইভাগ লোক একই ভাষায় কথা বলে। এদেশে আমাদের সবার মিলেমিশে থাকার কথা। বিশ্বব্যাংক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সূচকে বিভিন্ন দেশের অবস্থান পরিমাপ করে থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীর নিকৃষ্ট পাঁচ শতাংশ দেশে অন্তর্ভূক্ত। অর্থাত্ পৃথিবীতে ২০০টির মতো দেশ আছে, সেখানে ১৯০টি দেশের রাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে ভালো।
আকবর আলী খান বলেন, ‘গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। আমরা যখন শুনি বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা যখন বিপন্ন তখন আমাদের ধরে নিতে হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রও বিপন্ন। যেদেশে সাংবাদিকেরা নিরাপদে কাজ করতে পারে না সেদেশে গণতন্ত্র কোনদিন বিকশিত হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের অকতুভয় সাংবাদিকেরা। সাংবাদিকদের ওপর যখন হামলা করা হয়, তখন আমাদের সকলের ওপর হামলা হয়। আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সেই পরিপ্র্রেক্ষিতে আমি মনে করি, আজকে যেসব সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে সেটা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।’ তিনি প্রতিটি সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং তার মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। এটা শুধু সাংবাদিকদের জন্য দরকার না। সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত হলে গণমানুষের অধিকারও নিশ্চিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পুলিশ প্রশাসনকে উদ্দেশ করে আকবর আলী খান বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে পুলিশদেরকে সবিনয়ে মনে করিয়ে দিতে চাই, সাংবাদিকেরা পুলিশের সবচেয়ে বড় বন্ধু হতে পারে। কারণ যে কাজ তারা করতে চান সে কাজ সাংবাদিকের সহযোগিতা ছাড়া কোনো দিন করা সম্ভব না। কাজেই সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য আমাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গোলাম রহমান, বিএফইউজের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, প্রেসক্লাবের সভাপতি কামালউদ্দিন সবুজ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাধারণ সম্পাদক শাবান মাহমুদ, পত্রিকাটির প্রকাশক ও প্রধান সম্পাদক মেজর (অব.) মো. মোদাচ্ছের হোসাইন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এস এম হারুনার রশীদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

অথচ একই দিন প্রধানমন্ত্রী যা বললেনঃ

বিএনপি সরকারের সময় সাংবাদিকেরা ভয়ে কিছু লিখতে পারত না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিএনপি সরকারের সময় সাংবাদিকেরা এলাকায় থাকতে পারত না। গণমাধ্যম তখন ভয়ে কোনো কিছু লিখতে বা বলতে পারত না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারে আসার পর মিডিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাচ্ছে। প্রতিদিন সরকারের বিরুদ্ধে না লিখলে তাদের ভাত হজম হয় না। অনেক মিথ্যাও লেখা হয়। এতে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমরা বাধা দিই না।’
আজ শনিবার গণভবনে কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে পত্রপত্রিকা, টিভি আর টক শো দেখলে দেশের এক চিত্র পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামে দেখা যায় অন্য চিত্র। কিছু লোক আছে, সাধারণ মানুষ ভালো থাকলে তাদের ভালো লাগে না। তারা সুযোগ-সুবিধা পেতে ব্যস্ত। এ জন্য তাদের এত সমালোচনা।
শেখ হাসিনা বলেন, সাবেক জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নির্যাতিত হয়েছে। সে সময় থানায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মামলা নেওয়া হতো না। অন্যায় হলে কেউ বিচার পেত না। বরং উল্টো নেতা-কর্মীদের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হতো। কিন্তু এখন যে কেউ থানায় মামলা করতে পারে।
মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, দেশে এখন খাদ্য ঘাটতি নেই। খাদ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা বলে দেশের অবস্থা ভালো না, তারা আসলে দেশের ভালো চায় না। মানুষ ভালো থাকুক তা তারা চায় না। গরিব মানুষকে দিলে বোধহয় তাদের টান পড়ে। তাই তাদের হা-হুতাশ। কিন্তু গ্রামের মানুষের মধ্যে তো হা-হুতাশ দেখি না।’
মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের নেতা আশরাফুল ইসলাম, শেখ ফজলুল করিম, রোজি সিদ্দিকী, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

 

‘যারা ভালো চান না, হা-হুতাশ তাদেরই’

ঢাকা, জুন ০২ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিাফোর ডটকম)- সরকারের সমালোচকদের একহাত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াদের সমালোচনার পাশাপাশি গণমাধ্যম যাচাই না করেই সরকারের বিরুদ্ধে লিখছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের কুড়িগ্রামের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ভালোভাবেই দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু তা অনেকের ‘সহ্য’ হচ্ছে না।

“অনেকে আছেন, জনগণ ভালো থাকলে তাদের ভালো লাগে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের পছন্দ নয়। সকল সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিতে তারা অভ্যস্ত,” সমালোচকদের সমালোচনায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।

তিনি আরো বলেন, “যারা ভালো দেখেন না, তারা চান না মানুষ একটু ভালো থাকুক। জনগণ স্বস্তিতে থাকুক। আমরা যখন গরিব মানুষকে দিচ্ছি, তখন তাদের যত হা-হুতাশ। গ্রামের মানুষের কোনো হা-হুতাশ নেই।”

“মিডিয়া টক’শোতে এক চিত্র, আর গ্রামে গেলে আরেক চিত্র,” যোগ করেন শেখ হাসিনা।

সাম্প্রতিক সাংবাদিক নির্যাতনে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ১৪ সাংবাদিক নিহত এবং ১ হাজার ৪০০ আহত হয়েছিল।

“অনেক সাংবাদিককে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। অনেকে মামলা করতে পারেনি। আবার অনেকে নিজ এলাকাতেও থাকতে পারেনি। তখন পত্র-পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সে খবর আসেনি।”

বর্তমানে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই জানিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এই স্বাধীনতার অপব্যবহারও হচ্ছে।

“মিডিয়া এখন লিখছে। প্রতিদিন সরকারের বিরুদ্ধে না লিখেলে, তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। সত্য, না মিথ্যা তা যাচাই করার দরকার নেই। তাদের লিখতেই হবে। আমি প্রতিদিন পত্রিকাগুলো দেখি। কিছু দাগ দিয়ে রাখি। সম্পূর্ণ ভুয়া নিউজ।”

যাচাই না করে সংবাদ পরিবেশন করে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যম অনেক সময় দেশের ক্ষতি করছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

তৃণমূল নেতাদের প্রতি তার পরামর্শ- “অনেক কথা শুনবেন। কিন্তু, নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস রাখবেন।”

মতবিনিময় সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্যে সমালোচকদের সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “কেউ খেটে খেতে চাইলে এখন কাজের অভাব নেই। আমরা কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছি। দেশের একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না।”

সরকারের অর্জনগুলো জনগণের মধ্যে তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ প্রধান।

তিনি বলেন, “২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে আমরা আমাদের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে পারব। এই বিশ্বাস আমরা আছে। আমরা এটা পারব।”

“ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েই আওয়ামী লীগ ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। আওয়ামী লীগ গরিবের জন্য কাজ করে- তা অনেকের পছন্দ নয়। আওয়ামী লীগ তেলা মাথায় তেল ঢালতে পছন্দ করে না,” বলেন শেখ হাসিনা।

সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাধারণ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, সংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, উপ দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাসও ছিলেন।