ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারেন না উপদেষ্টা

অরুণ কর্মকার | তারিখ: ০৭-০৬-২০১২ প্রথম আলো

ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যৌক্তিকতা ও বিরোধিতার বিষয়টি স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ওই বিরোধিতাকে অজ্ঞতা, জ্ঞানপাপ কিংবা সরকারের বিরোধিতা বলেও ক্ষান্ত না হয়ে ‘দেশবিরোধিতা’ পর্যন্ত বলে ফেলাই এ স্পর্শকাতরতার উৎস।
বিষয়টি নিয়ে এর আগে কোনো আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক এ পর্যায়ে পৌঁছেনি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার কল্যাণে যখন পৌঁছাল, তখন ওই সব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করার তিন বছর এবং বর্তমান সরকারের শাসন মেয়াদের চতুর্থ বছরের প্রায় অর্ধেক শেষ। তা ছাড়া ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দেশ উল্লেখযোগ্য কিছু পাচ্ছে বলে মানুষ বিশ্বাস করে না।
কারণ, আমদানি করা তরল জ্বালানিচালিত (ডিজেল ও ফার্নেস তেল) এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কখনোই পূর্ণ ক্ষমতায় চলেনি। কখনো তার কারণ ছিল কেন্দ্রগুলোর অক্ষমতা। কখনো বা জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য। এ সত্য সবাই জানলেও ওই কেন্দ্রগুলো প্রকৃতপক্ষে কত কম চালানো হয়েছে, তা জানলে যে কেউ-ই বিস্মিত হবেন। তবে সেই হিসাব উত্থাপনের আগে শুরুর কথাটা একটু মনে করা দরকার।
শুরুর কথা: বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক অবস্থা তখন খুব শোচনীয় ছিল। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি ছিল দুই হাজার মেগাওয়াট। নতুন চাহিদা বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। বিদ্যুৎ খাতের এ পরিস্থিতি সরকারের খুব ভালোই জানা ছিল। কেননা, গত সংসদ নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারি দল যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল, তা প্রণয়নের জন্য এ খাত সম্পর্কে গভীর তথ্যানুসন্ধান করে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এ খাতের উন্নয়নে সরকারের প্রথম করণীয় ছিল দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নিতেই আট মাস পার করেন এই উপদেষ্টা। যদিও এ সিদ্ধান্ত তাঁর কোনো নতুন উদ্ভাবন ছিল না।
ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ প্রথম নিয়েছিল বিগত চারদলীয় জোট সরকার। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের অন্যান্য প্রকল্পের মতো এ উদ্যোগও তারা বাস্তবায়িত করতে পারেনি। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেয়। বর্তমান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সেগুলোও আছে।
শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিতে এ বিলম্বের কারণে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া বোরো মৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুতের ঘাটতি আলোচনায় চলে আসে। তখন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কয়েকটি ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র করা হবে ডিজেলচালিত। কেননা এগুলো তিন মাসের মধ্যে শেষ করা যায়। কিন্তু ফার্নেস তেলের চেয়ে এর বিদ্যুতের দাম পড়ে প্রায় দ্বিগুণ।
এই যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গাফিলতি বা অজ্ঞতার কারণে জাতির ঘাড়ে কিছু বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপল, এর সমালোচনা করা অসমীচীন হবে কেন?
সমালোচনা কমই ছিল: তার পরও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র করার বিরোধিতা বা সমালোচনা ছিল সামান্যই। মন্ত্রণালয় একের পর এক ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেছে। পাঁচবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। সবকিছুই মানুষ মেনে নিয়েছে বিদ্যুৎ পাওয়ার আশায়। এখন বিদ্যুৎ না পেয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সমালোচকদের ওপর চড়াও হয়েছেন। সমালোচকদের আশঙ্কাই যে সত্যি হলো, সেটা উপদেষ্টা অস্বীকার করবেন কী করে?
বিদ্যুৎ দরকার তাড়াতাড়ি। বিভিন্ন পেশাজীবীর মধ্যে তখন আলোচনা ছিল, কীভাবে কম সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ দেওয়া যায়। সরকার উদ্যোগ নিল বিনা দরপত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিশেষ আইন করার। বড় কোনো সমালোচনা ছাড়াই জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করল। সেই আইনের আওতায় দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের কাজ দেওয়া হলো।
২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশের মানুষ বিদ্যুৎ-পরিস্থিতি উন্নতির আশায় ছিল। তারা ‘লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশ’ পাওয়ার আশায় তীব্র লোডশেডিংও মুখ বুজে মেনে নিয়েছে।
সরকার এ সময় শুধু যে ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র করেছে, তা নয়। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনেরও প্রক্রিয়া চালিয়েছে, কার্যাদেশ দিয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়ায় সরকার প্রথমে ঘোষণা করেছিল যে ২০১১ সালের গ্রীষ্মে দেশ লোডশেডিংমুক্ত হবে। তারপর বলা হয় ২০১২ সালের কথা। কিন্তু এ বছরের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং মানুষকে যুগপৎ হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। এখন মানুষের কাছে তো বটেই, সরকারের কাছেও লোডশেডিংমুক্ত দেশ এক অলীক স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়।
অজুহাত তেলের দাম: এ বছর এসে বিদ্যুতের এই অবস্থা হলো কেন? উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বলেছেন, তেলের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় তেল কিনে কেন্দ্র চালানো যায়নি। কিন্তু তেলের দাম যে বাড়তে পারে, তা তো সবারই জানা কথা। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ যখন শুরু করা হয়, তখন সরকারের পরিকল্পনায়ও তো এটা ছিল। তার চেয়েও তেলের দাম বেশি বাড়তে পারে। সে জন্য উৎপাদন ব্যাহতও হতে পারে। কিন্তু তা কতটা?
সরকারি হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে তেলচালিত সব শ্রেণীর কেন্দ্রগুলোর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা দুই হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, যা শক্তির হিসাবে ৫৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বা সাড়ে পাঁচ কোটি ইউনিট। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন করা হচ্ছে সাড়ে নয় কোটি ইউনিটের মতো। এর মধ্যে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে করা হচ্ছে মাত্র ৫৫ লাখ ইউনিট।
গত ২২ মার্চ দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয় (ছয় হাজার ৬৫ মেগাওয়াট)। সেদিনও তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে শক্তির উৎপাদন ছিল মাত্র দেড় কোটি ইউনিট। সেদিন তেলের জন্য ব্যয় হয়েছিল ২৩ কোটি টাকা। পিডিবি সূত্র জানায়, তাঁদের হিসাব অনুযায়ী এখন গ্যাসের সরবরাহ যেমন আছে, তার সঙ্গে প্রতিদিন ২০ কোটি টাকার জ্বালানি তেল পোড়ালে লোডশেডিং সহনীয় রাখা সম্ভব। এতে সরকারের যে পরিমাণ ভর্তুকি লাগবে (বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার মতো) তা দেওয়ার জন্য শুরুতে হিসাব করেই নেওয়া হয়েছিল।
ভর্তুকি থেকে রেহাই নেই: পিডিবির সূত্র অনুযায়ী, যে পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়ার হিসাব করা হয়েছিল তা-ও দেওয়া হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিদ্যুতের জন্য তেল কেনায় ভর্তুকি দিয়ে অর্থনীতির চাপে পড়ার কথা একাধিকবার বলেছেন। আবার একই সঙ্গে গত কিছুদিনের মধ্যে মোট ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও তিনটি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে যে তেলের দাম আরও বাড়বে না কিংবা অনেকটাই কমবে—এমন নিশ্চয়তা তাঁরা কোথায় পেলেন?
সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেল দিচ্ছে না ভর্তুকি বাড়ার অজুহাতে। অথচ বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের প্রতিটি শিল্প ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা করে যে জেনারেটর চালায়, লাখ লাখ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন যে দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা করে জেনারেটর চালায়, সেই তেলেও তো সরকারেরই ভর্তুকি যায়। দেশের যেকোনো একজন মানুষ এক লিটার ডিজেল বা ফার্নেস তেল কিনলেই সরকারের ২৬ টাকা ভর্তুকি চলে যায়। এটা সরকার সামাল দেবে কী করে?
সরকার এখন পর্যন্ত কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক যেসব বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কার্যাদেশ দিয়েছে, তার একটিও বর্তমান সরকারের মেয়াদে চালু হবে না। কাজেই বিদ্যুৎ-পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে। এসব চিন্তায় হয়তো উপদেষ্টা মেজাজ হারিয়ে ফেলছেন। তিনি কি বুঝতে পারছেন, এর দায় তিনি এড়াতে পারবেন না?