বাবা হত্যার বিচার চাইল শ্রমিকনেতা আমিনুলের মেয়ে

প্রথম আলো, জুন ৮, ২০১২

মা বলে দিয়েছেন, কথা বলতে হবে, কান্না করা যাবে না। তাই গলা ধরে এলেও নিজেকে সামলে নিয়ে মঞ্চে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলে সায়মা আক্তার। কিন্তু বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে গিয়ে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারেনি ১৫ বছরের এই কিশোরী।

তার বাবা শ্রমিক সংগঠক আমিনুল ইসলাম গত ৪ এপ্রিল আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হন। ৫ এপ্রিল পুলিশ তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ পায় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ঘাটাইল থানা এলাকায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সভায় ‘আমিনুলের জন্য ন্যায়বিচার দাবি কার্যক্রম’ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখানে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্যসহ আমিনুলের মেয়ে বক্তব্য দেয়। আমিনুল বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) নামে একটি বেসরকারি সংস্থার সংগঠক এবং শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতা ছিলেন।
সভায় ছয় সদস্যের ‘ন্যায়বিচার দাবি কমিটি’ ঘোষণা করা হয়। আমেরিকান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল লেবার সলিডারিটির জ্যেষ্ঠ কাউন্সিলর এ কে এম নাসিম ও বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তারকে কমিটির সমন্বয়ক করা হয়েছে। আমিনুলের মেয়ে সায়মাসহ চারজন সদস্য রয়েছেন এই কমিটিতে।
কমিটি গঠন সম্পর্কে এ কে এম নাসিম বলেন, ‘বাংলাদেশে যেকোনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত দুই-চার মাস পর থিতিয়ে যায়। কিন্তু আমরা আমিনুলের ঘটনার শেষ দেখতে চাই। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমিনুলের হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে এ কমিটি পুলিশকে সাহায্য করবে।’

সভায় বেসরকারি সংস্থা অধিকার-এর সভাপতি সিআর আবরার বলেন, ‘আমিনুল হত্যার বিচার দাবিতে এখন সবার একত্র হওয়া দরকার। যাঁরা সত্য বলতে চান, শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, এ রকম ঘটনা তাঁদের যে কারও জীবনে ঘটতে পারে।’
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের যুগ্ম সম্পাদক শফিউল ইসলাম বলেন, গুপ্তহত্যা, গুমের রহস্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে না। এর পেছনে সরকার, কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি—যেই থাকুক না কেন, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

 

শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ড, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে শ্রমিক অধিকার সমর্থকদের আন্দোলন, টিকফা চুক্তি না হওয়া, বাংলাদেশের জিএসপি-সুবিধা বাতিলের জন্য এএফএল-সিআইও আবেদন এবং সে দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা।

শ্রমিক সংগঠক আমিনুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা গতকাল বৃহস্পতিবার শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে দেখা করতে গেলে মন্ত্রী তাঁকে এ তথ্য জানান। বেলা পৌনে তিনটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এ সময় তাঁরা বাংলাদেশের শ্রমবাজার, শিশুশ্রম, বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের যাওয়া, মানবপাচারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

বৈঠকে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের শিশুশ্রম পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, সরকার শিশুশ্রম বন্ধে একটি নীতিমালা করেছে। বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাজ করতে যাওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এখন বাংলাদেশ থেকে যারা কাজ করতে যাচ্ছে, তারা স্মার্ট কার্ড নিয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের সব তথ্য থাকছে। এ ছাড়া মানবপাচার বন্ধে সরকার নতুন আইন করেছে।

বৈঠকের একপর্যায়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। এ সময় মন্ত্রী তাঁকে বলেন, ‘শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম কখনোই সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়িত ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে সরকারের কোনো সমস্যা নেই। কেন, কীভাবে তাঁকে হত্যা করা হলো সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করছে। তদন্তে এ বিষয়ে বিস্তারিত বেরিয়ে আসবে।’