বাজেট ২০১২-১৩ প্রতিক্রিয়া

আমি যা বুঝেছি তা হলো এই রকম

অন্যান্য প্রতিক্রিয়া

বাজেটে চমক নেই, আছে ইন্দ্রজাল: সিপিডি

ছবি: শাহাদাত পারভেজ

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন সহজ রাস্তায়। কোনো সৃজনশীলতা এখানে নেই। নেই কোনো চমক, উদ্ভাবনী আকর্ষণ। আবার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে ব্যয়নীতি গ্রহণেরও সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না।

নির্বাচনের আগের বছর এসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চুক্তি করে মাত্র ১০০ কোটি ডলার ঋণ করতে গিয়েই এ অবস্থা হয়েছে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এককথায় বাজেট সম্পর্কে বলেন, ‘এত সুন্দর দেখা যাচ্ছে যে সত্য বলে মনে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর রাজস্ব আয়ের চেষ্টা একটা ‘ইন্দ্রজাল’ অবস্থা তৈরি করেছে। সামগ্রিক বাজেট ব্যাকরণ ও প্রথা-সিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবসম্মত নয়।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান যোগ করেন, এ বাজেটে জনগণের উপকার হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ওপরই জনগণের উপকার নির্ভর করবে। আর দেবপ্রিয় বলেন, এ বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনিক বিপ্লব প্রয়োজন হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বলেন, বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় সাম্যের পরিবর্তে অসাম্য তৈরি হয়েছে। যেমন—মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলো না। উল্টো একই সীমা রেখাতে দুই হাজার টাকা থেকে সর্বনিম্ন কর তিন হাজার টাকায় করা হলো। যা সামাজিক সাম্যের পরিপন্থী কাজ হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য যা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মত দেন দেবপ্রিয়। এমন আরও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অসাম্যের তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

অন্যবারের মতো জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবনার পরের দিনই আজ শুক্রবার সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিপিডি প্রস্তাবিত বাজেটের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরে। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।

সিপিডি মনে করে, প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী বছর প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক দুই শতাংশ অর্জন করা এবং মূল্যস্ফীতির হার সাত দশমিক পাঁচ শতাংশে ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হবে। দেবপ্রিয় বলেন, ‘বাজেটে যেসব ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে তাতে এ কথা স্পষ্ট যে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী হবে। সে অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই দুরূহ হবে বলে আমরা মনে করি।’

দেবপ্রিয়ের মতে, এ বাজেটের লক্ষ্য পূরণের জন্য যে নীতি কাঠামো প্রয়োজন, তা অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনায় অনুপস্থিত। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সম্পর্কে সিপিডি বলেছে, তাদের সংস্থার অবস্থান বরাবরই এ ধরনের সুযোগের বিরোধী এবং তা নৈতিকও নয়। কেননা, তাতে সত্ করদাতারা ক্ষতিগ্রস্ত ও নিরুত্সাহিত হন। উপরন্তু, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এটা নেই। আছে অর্থ বিলে, যা একধরনের আড়াল করার চেষ্টা বলেই মনে হয়।

দেবপ্রিয় বলেন, পুরো বাজেটে মোট ভর্তুকির পরিমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর সংবেদনশীল বিষয় আড়াল করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু কীভাবে কত মাসে এটা করা হবে, এর দিক-নির্দেশনা নেই। তিনি বলেন, এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা মানুষের মধ্যে জমতে থাকবে। ভারতকে বৃহত্তর আঙ্গিকে ট্রানজিট দিলে কত আয় হবে বা অতীতে যে সীমিত পরিসরে ট্রানজিট দেওয়া হয়েছে, এতে কি আয় হলো—এর হিসাব অর্থমন্ত্রী দেননি। বাজেট বক্তব্যে বিরাষ্ট্রীয়করণ শব্দটি পর্যন্ত নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন সম্পর্কে, আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি একেবারের বক্তব্যে আনেননি অর্থমন্ত্রী।

দেবপ্রিয় বলেন, বছরটি যে চ্যালেঞ্জিং হবে, তা আগে থেকেই বলা হচ্ছিল। অর্থমন্ত্রী তা স্বীকারও করেছেন। কিন্তু সামগ্রিক অনুধাবনে তা প্রকাশ হয়েছে মনে হয় না। প্রথাগত ধারণার মধ্যেই থেকে গেছে বাজেট বক্তৃতা। আর্থিক শৃঙ্খলার রক্ষা কবচ নেই। ব্যাকরণ-সিদ্ধ বাজেট হলো, কিন্তু এতে আর্থিক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট সরকারের ব্যর্থতার দলিল: মওদুদ

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে সরকারের ‘ব্যর্থতার দলিল’ আখ্যায়িত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থনীতি আরও অবনতি ঘটবে।

বাজেটের পরদিন শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেট সরকারের ব্যর্থতা দলিল। গত বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জাতীয় প্রবৃদ্ধিসহ অনেক খাতেই সরকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। সংকোচন নীতির ওপর নির্ভর করে তারা ২০১২-১৩ অর্থ বছরের বাজেট প্রণয়ন করছে।”

“এই বাজেটে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসবে না। দ্রব্যমূল্য কমবে না, বিনিয়োগ ও রপ্তানি কোনোটিই বাড়বে না। বরং মুল্যস্ফীতি বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থানও হবে না। ফলে দেশের অর্থনীতির আরও অবনতি ঘটবে।’’

সরকার ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করাও সম্ভব হবে না বলেই মনে করেন বিএনপির এই নেতা।

“৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় সরকার পৌঁছাতে পারবে না”, বলেন মওদুদ।

সরকার নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি না মানলে রাজপথেই এর ‘ফয়সালা’ হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সোমবার ঢাকার সমাবেশ থেকে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা দেবেন।”

সরকার নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিলে বিএনপি আর কোনো কঠোর কর্মসূচি দেবে না বলেও উল্লেখ করেন মওদুদ।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল এই আলোচনা সভার আয়োজ করে।

সংগঠনের সভাপতি এম এম মেহবুব রহমানের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আ ন হ এহছানুল হক মিলন, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক গাজী মাজহারুল আনোয়ার, যুব দল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংসদ মোস্তফা আলী মুকুল, কেন্দ্রীয় নেতা আবু নাসের মো. রহমাতুল্লাহ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

ধারাবাহিকতার বাজেটঃ মেনন

২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সুসংবাদ কিংবা দুঃসংবাদ দুটোর কিছুই দেখছেন না ক্ষমতাসীন মহাজোট শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

বাজেট ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার রাতে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজেটে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে মাত্র। সুসংবাদ নেই, কোনো দুঃসংবাদও নেই।”

জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে বাজেটে বরাদ্দ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এই সভাপতি বলেন, এ নিয়ে কমিটির বৈঠকে আলোচনা করবেন তিনি।

ঘোষিত ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকার বাজেট কতটুকু বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে বামপন্থী এই নেতার।

“বিদ্যুৎ খাতের বিষয়ে বাজেটে বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই, নির্দেশনা থাকলে ভালো হতো। কারণ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন তিনি।

প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার দলিল’ অভিহিত করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

দলের সভাপতি মনজুরুল আহসান খান এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এক বিবৃতিতে বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নীতি ও দর্শনের দিক থেকে গতানুগতিক এবং ধনিক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার দলিল।

বিবৃতিতে বলা হয়, “এই বাজেট মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারা তথা চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ভিত্তিতে রচিত হয়নি। এতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষের জন্য কিছু লোক দেখানো প্রচেষ্টা থাকলেও বাজেটের সামগ্রিক আয়োজনের লক্ষ্যই হলো ধনীকে আরো ধনী হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।”

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মনে করে, ঋণনির্ভর-ঘাটতি বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি ও জনগণের দুর্দশা বাড়াবে।

দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, “অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার যে লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে ঘোষণা করেছেন, তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার সামিল।”

ব্যবসাবান্ধব হলেও অর্থনীতিতে চাপ বাড়বেঃ এফবিসিসিআই

প্রস্তাবিত ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেটকে আপাতদৃষ্টিতে একটি প্রবৃদ্ধি, ব্যবসা ও পুঁজিবাজারবান্ধব বাজেট বলে মন্তব্য করেছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)।

তবে সংস্থাটি বলছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়া, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধ, সরকারি কর্মকর্তাদের ঋণ ও অগ্রিম নেওয়ার পরিমাণ বাড়ানো আগামী দিনে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে। একই সঙ্গে মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়া নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আজ শুক্রবার রাজধানীর মতিঝিলে ফেডারেশন ভবনে বাজেট-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে এমন পর্যবেক্ষণই তুলে ধরেছেন এফবিসিসিআই সভাপতি এ কে আজাদ।

সংবাদ সম্মেলনে এ কে আজাদ বলেন, ‘বর্তমানে অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন চোখে পড়লেও এখনো বাংলাদেশকে বেশ কিছু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে আছে ইউরোপের অঞ্চলগুলোতে চলমান ঋণসংকট, রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি। এতে প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।’

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বাজেট ঘাটতি জিডিপির পাঁচ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এটা অনেক বেশি। ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাংক থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে বলে ঠিক করেছে। এতে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমে যেতে পারে। ফলে আবারও তারল্যসংকট দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে। এসব কারণে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে এ কে আজাদ বলেন, ‘সরকার কেন এই সুযোগ দিয়েছে, তা সরকারকেই প্রশ্ন করুন। তবে এই সুযোগ আমরা যারা বৈধ করদাতা তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ। এতে সত্ করদাতারা কর দিতে নিরুত্সাহী হবেন। আর যদি কালো টাকা সুযোগ দিতেই হয়, তবে যত বছর ধরে কর দেননি প্রতি বছরের কর তার কাছ থেকে আদায় করা উচিত।’

উৎস কর প্রত্যাহার না করলে পোশাকশিল্প বাধাগ্রস্ত হবেঃ বিজিএমইএ

২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিল্পকে উতৎসাহিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজেটে রপ্তানির ক্ষেত্রে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে উৎস কর কর্তনের প্রস্তাব পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করবে। একই সঙ্গে তা ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে বিজিএমইএ।

বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা এসব কথা বলেন। আজ শুক্রবার সকালে নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সমিতির সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন।
সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বিশ্বমন্দার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের রপ্তানি কমে গেছে। চলতি অর্থবছরে ইউরোপ ও আমেরিকায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৪০ ও ২৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে মজুরি, বিদ্যুৎ, পরিবহন খরচ ও ব্যাংক সুদের হার বাড়ার কারণে পণ্যের উৎপাদন মূল্য বেড়েছে ১০ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না মন্তব্য করে বিজিএমইএর সভাপতি বলেন, ‘পরবর্তী অর্থবছর আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের ওপর প্রত্যক্ষ কর ধার্য করা সরকারের উচিত হয়নি। এটি প্রত্যাহার করা না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প ও বিনিয়োগ উদ্যোক্তারা নিরুত্সাহিত হবেন।’
বিজিএমইএর সভাপতি রপ্তানির ক্ষেত্রে দশমিক ৪০ শতাংশ হারে উৎস কর কর্তনের অনুরোধ জানান। সম্ভব না হলে বর্তমানের মতোই দশমিক ৬০ শতাংশ রাখার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি পোশাক খাতের প্রণোদনার মেয়াদ আরও অন্তত তিন বছর বাড়ানোর দাবি জানান।
তবে আগামী বাজেটে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের কারখানার স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব স্বাগত জানিয়েছে বিজিএমইএ। তারা মনে করে, এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উপকৃত হবে। এ ছাড়া আগামী বাজেটে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) প্লান্টের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কহার শূন্য, ইটিপি স্থাপনে ২০০ কোটি টাকার তহবিল এবং রপ্তানি উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়তে ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে বিজিএমইএ।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহসভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, ফারুক হাসান, আবদুল মান্নান, পরিচালক এস শহীদুজ্জামান, শফিউল আজম প্রমুখ।

বাজেটে ধনী, লুটপাটকারীদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছেঃ বাম দল ও সংগঠনের সভা-বিবৃতি

২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রত্যাখ্যান করেছে কয়েকটি বাম রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। আজ শুক্রবার পৃথক কর্মসূচি ও বিবৃতিতে এসব দল ও সংগঠন বলেছে, এই বাজেটে কেবল ধনী ও লুটপাটকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ঢাকা কমিটি আজ রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আশরাফ হোসেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, এই বাজেট কালো টাকার মালিক ও লুটেরা ধনীদের স্বার্থ রক্ষাকারী। এই বাজেট তাঁরা মানেন না। বাজেটে জিডিপি যে হারে অর্জনের কথা বলা হয়েছে, তা অর্জন প্রায় অসম্ভব।

গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার এক সভায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেট ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য আরও বাড়াবে। বাজেটে নানা আশাবাদ আছে। কিন্তু বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। তোপখানা রোডে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন মোর্চার সমন্বয়ক বজলুর রশীদ।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। স্কপের নেতা রায় রমেশ চন্দ্র, জাফরুল হাসান, ওয়াজেদুল ইসলাম খান প্রমুখের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে শ্রমিকদের কল্যাণে কোনো প্রতিফলন নেই।

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বিবৃতিতে বলেন, বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-সংকটের সমাধান ও মুদ্রাস্ফীতি জর্জরিত সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুখবর দিতে পারেনি।

ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক এক বিবৃতিতে বলেন, এই বাজেট গরিব ও সাধারণ মানুষের স্বার্থপরিপন্থী। বাজেটে নতুনত্ব নেই। করের আওতা বাড়ানোর কারণে গরিব মানুষের দায়-দেনা বাড়বে।

বাংলাদেশ ন্যাপের সভাপতি জেবেল রহমান ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ঘোষিত বাজেট লুটপাটের ধারাকে অব্যাহত রাখবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখার ফলে লুণ্ঠন ও অনৈতিকতা উৎসাহিত হবে।

গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সভাপতি নির্মল সেন এক বিবৃতিতে বলেন, এই বাজেটের ফলে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে; লুটেরা, ধনী আর কালো টাকার মালিকেরা লুটপাটের সুযোগ পাবে।

পুলিশের পদমর্যাদা না বাড়ায় অর্থমন্ত্রীর ওপর ক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেও পুলিশের পরিদর্শকদের পদমর্যাদা প্রথম শ্রেণী এবং উপপরিদর্শকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে পুলিশ সদস্যরা।

এর পেছনে অর্থমন্ত্রীর আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ভূমিকা রয়েছে বলে বাংলাদেশ পুলিশ এসোসিয়েশনের নেতারা মনে করছেন। পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) থেকে কনস্টেবল পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নিয়ে এই সংগঠন গঠিত।

পদমর্যাদার উন্নয়ন সংক্রান্ত ফাইল অর্থমন্ত্রীর টেবিলে পড়ে আছে বলে দাবি করে পুলিশ এসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী দুইবার বলার পরেও এ সংক্রান্ত ফাইল অর্থমন্ত্রীর টেবিলে কেন পড়ে আছে এটাই এখন আমাদের প্রশ্ন।”

এ নিয়ে তারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।

শাহবাগ থানার ওসির দায়িত্বে থাকা সিরাজুল ইসলামসহ তাদের সংগঠনের কয়েকজন নেতা বুধবার পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শহিদুল হকের সঙ্গে তার কার্যালয়ে দেখা করে তাদের পদমর্যাদার উন্নয়নসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সিরাজুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার নিজেদের মধ্যে সভা করে সিদ্ধান্ত পরদিন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের সঙ্গে দেখা করে জানিয়ে এসেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এক সেমিনারে পুলিশের ঘুষ খাওয়া নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাপারে এসোসিয়েশনের সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন, সবখানে দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। আর এই দুর্নীতির শীর্ষে পুলিশ বাহিনী। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবাই ঘুষ খায়।

ওই কর্মকর্তা জানান, ফেনীতে সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার ঘটনা নিয়ে সদর থানার ওসি নাজিমউদ্দিনকে প্রত্যাহার যুক্তিসংগত হয়নি বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়। এ নিয়ে সভায় নিন্দাও প্রকাশ করা হয়।

প্রায় এক মাস আগে থানার পাশে একটি সম্পত্তি থেকে দখলদারদের উচ্ছেদের সময় সহকারি কমিশনার (ভূমি), ইউএনও এবং ভূমি কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিতের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফেনী সদর থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শহিদুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার সঙ্গে দেখা করে তারা তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছে। হতাশ না হয়ে তাদের ভালোভাবে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি বলেন, পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। তাই সে অনুযায়ী তাদের কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ বাজেট সময়োপযোগী, বাস্তবায়ন করতে পারবঃ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাবিত বাজেটকে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এ বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারব। এর ফল যাতে জনগণ পায়, সে ব্যবস্থাও করা যাবে।’

আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলীয় সাংগঠনিক সম্পাদকেরা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। তৃণমূলের সম্মেলন শেষ করা জন্য সাতটি কমিটি করে দেওয়া হয়। সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের তারিখও বৈঠকে চূড়ান্ত করা হয়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সবগুলো বাজেটেই আমাদের লক্ষ্য থাকে শিক্ষার মান বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করা, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা।’ বাজেটের ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক। অতীতেও বাজেটে পাঁচ ভাগ ঘাটতি ছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজেট প্রণয়নের আগে সবার সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়েছে। অতীতে কোনো সরকার তা করেনি। বাজেট নিয়ে কিছু মানুষ অখুশি হতে পারে। বিরোধী দল লুটপাট, দুর্নীতি করতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই তারা অখুশি। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি অর্জনে আওয়ামী লীগের অবদান আছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই মানুষ কিছু পায়।

শেখ হাসিনা বলেন, এবার ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়েছি। বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কমেছে। বেতন বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ওয়াদা থেকে বেশি কাজ করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেট সার্ভিস দেওয়ার কথা থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত এই সার্ভিস দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রত্যেক ক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। এর সুফল জনগণ পাচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগ্রত হয়। যার ফলে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়। সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদের হাতে যাতে মানুষ জিম্মি না হয়, সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিনি বলেন, ২০০১ সালের পর মানুষের স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়া হয়। অপারেশন ক্লিনহার্টে নামে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়। আবার দায়মুক্তিও দেওয়া। তখন সারা দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মহোৎসব চলে। এমনকি আমরাও এ থেকে রেহাই পাইনি।