ইসি খুব শক্তিশালী, দাবি সিইসির

প্রথম আলো জুন ২১, ২০১২

বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিজেকে খুব শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর মনে করছে। সরকার বা প্রশাসনের ওপর তাদের নাকি কর্তৃত্ব বাড়ানোর কোনোই প্রয়োজন নেই।
আগের কমিশন ইসির ক্ষমতা বাড়াতে এবং নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে সরকারের কাছে একটি সুপারিশ পেশ করেছিল। এতে নির্বাচনকালে চারটি মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান ইসি সেই সুপারিশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিব উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের সময় সরকারের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া আছে। সরকার আন্তরিক থাকলে দলীয় বা নির্দলীয় যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
আগের কমিশন চারটি মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের যে সুপারিশ করেছে, সে সম্পর্কে সিইসি বলেন, ‘চারটি মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব বাড়াতে গেলে আমাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পালন করতে পারব না।’
এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন সাবেক সিইসি এ টি এম শামসুল হুদা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়ের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর জন্য কোনো প্রস্তাব করিনি। আমাদের প্রস্তাবে বলা আছে, সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যাতে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে জন্য নির্বাচনের সময় চারটি মন্ত্রণালয় কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুপস্থিতিতে এই বিধান ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু করা কঠিন হবে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সব মহল থেকেই নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলছেন। অথচ ইসি নিজেকে শক্তিশালী করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিরোধী দল বিএনপি নির্দলীয় সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও চায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচনের সময় ইসির ওপর সরকারের কর্তৃত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। আগের কমিশন ইসির ওপর সরকারের কর্তৃত্ব কমানোর জন্য যে প্রস্তাব করেছে, তা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু আসল কথা হলো, ইসি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, দলীয় সরকারের অধীনে তাদের নিরপেক্ষ থেকে কাজ করা সম্ভব নয়, সরকার হস্তক্ষেপ করবেই।
সাবেক সিইসি এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন গত ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ শেষের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ এবং ভোটার তালিকা আইনসহ অন্যান্য নির্বাচনী আইন সংস্কারের প্রস্তাব করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৪৪-ই ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ইসির সঙ্গে পরামর্শ না করে সরকার নির্বাচন-সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না। এ ছাড়া সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ইসির সঙ্গে পরামর্শ করবে। ভোটার তালিকা আইন সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়, ইসি প্রতিবছর নিজেদের সুবিধামতো সময়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করবে। জানুয়ারিতে স্থানীয় নির্বাচনের চাপ থাকায় ২০০৮ সালে আইন হওয়ার পর থেকে কখনো নির্ধারিত সময়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। সে জন্যই কমিশন নতুন প্রস্তাব করেছে। কমিশন সচিবালয় সূত্রমতে, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য আগের কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৪৪-ই ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। বর্তমানে যে বিধান আছে, তা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কমিশনের অনুমতি ছাড়া মহানগর পুলিশ কশিনার, উপকমিশনার, পুলিশ সুপার, তাঁদের অধস্তন কর্মকর্তা ও ভোট গ্রহণের জন্য গঠিত প্যানেলের কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি করা যাবে না। আগের কমিশন মনে করে, প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত রাখতে শুধু এ বিধান যথেষ্ট নয়। এ জন্য চার মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
নির্বাচনী আইন সংস্কারের এ প্রস্তাবটির ব্যাপারে বর্তমান কমিশনের মতামত নিতে আইন মন্ত্রণালয় গত মার্চে তা ইসিতে পাঠায়। ইসি এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিধান বহাল রেখে আগের কমিশনের প্রস্তাব নাকচ করেছে।
চার মাসে শুধু সভা করেছে ইসি: সিইসি কাজী রকিব উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের কমিশন গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়। এরপর চার মাসের বেশি সময়ে এই কমিশন ১৭টি সভা করেছে। কিন্তু উল্লেখ করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বরং ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতার বিষয়টি বেশি আলোচিত হচ্ছে। কারণ, তফসিল ঘোষণার আগে ঢাকার দুই সিটির সীমানা নির্ধারণের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে কোনো তাগিদ দেয়নি ইসি। এ ছাড়া গত নভেম্বরে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হলেও কমিশন এখন পর্যন্ত বিধি প্রণয়নের কাজ শেষ করতে পারেনি। ফলে সাড়ে তিন বছরেও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা পরিষদ গঠন করা সম্ভব হয়নি। চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের মৃত্যুজনিত কারণে কয়েকটি উপজেলা শূন্য ঘোষিত হলেও ইসি এখন পর্যন্ত এসব উপজেলায় নির্বাচন করতে পারেনি।
ইসি ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু করলেও মাঠপর্যায় থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসছে। নির্বাচন কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটার হওয়ার জন্য প্ররোচিত করছেন। কোনো যাচাই ছাড়াই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়া হচ্ছে। ইসি এসব অভিযোগ শুনলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।