বিশ্ব দুর্নীতি দিবস

শিবের গীত

বিশ্ব দুর্নীতি(মুক্ত) দিবস

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম | প্রথম আলো তারিখ: ২৭-০৬-২০১২

সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ঢাকায় দুই দিনব্যাপী এক দুর্নীতিবিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করে। এই সম্মেলনে যোগ দিতে আসা এক তরুণ আমাকে জিজ্ঞেস করল, বছরের একটি দিন দুর্নীতিমুক্ত দিবস হিসেবে পালন করলে কেমন হয়? তার চিন্তাটি ভালো: প্রতিবছর প্রতিদিনই আমরা কোনো না কোনো দিবস পালন করছি, যেমন তামাকমুক্ত দিবস অথবা হাত ধোয়া দিবস। তাতে আর কিছু না হোক, এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়। তবে দেশের ঠাকুর ফেলে আমরা যেহেতু বিদেশি কুকুর ধরতে অস্থির এবং ওস্তাদ, তাতে দিবসটি শুধু দেশীয় হলে তেমন সাড়া পাওয়া যাবে না। বস্তুত, তামাকমুক্ত দিবস অথবা হাত ধোয়া দিবসের আগে ‘বিশ্ব’ থাকায় আমরা শুধু বিড়ির দিকে নজর না দিয়ে সিগারেটের দিকেও দিচ্ছি এবং হাত যেনতেনভাবে একটু পানি ঢেলে না ধুয়ে লাক্স সাবান ও হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ধুচ্ছি। ফলে কিছুটা ফল পেতে হলে দুর্নীতিমুক্ত দিবসের আগেও ‘বিশ্ব’ শব্দটি জুড়ে দিতে হবে।
বিশ্ব সাদাছড়ি দিবস দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিরাপদে চলাচলের বিষয়টি নিশ্চিত করতে আমাদের সচেতন করে—যদিও ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে নিরাপদে চলাচলের জন্য এক জোড়া, এমনকি চার জোড়া স্বাস্থ্যবান চোখও যথেষ্ট নিশ্চয়তা দেয় না। নিশ্চয়তা যেহেতু নির্ভর করে যানচালকের কৃপা ও দাক্ষিণ্যের ওপর, ভয় হয়, বিশ্ব দুর্নীতিমুক্ত দিবসটিও বিপরীত একটি অবস্থারই সৃষ্টি করবে। বিশ্বের অনেক দেশে এ দিবসটি ইতিবাচক একটি ভূমিকা পালন করলেও বাংলাদেশে ঘটবে উল্টোটি। যেমন, সারা দেশে রেল চলবে না, যেহেতু সাবেক রেলমন্ত্রী কথিত কালো বিড়ালদের সেদিন তাদের থাবা গুটিয়ে রাখতে হবে, ফলে রেলের চাকা যাবে বন্ধ হয়ে। সারা দেশের প্রশাসনে কোনো কাজ হবে না, যেহেতু বড় বড় দান বাদ দিলেও গত্যর্থ (গতি+অর্থ) অর্থাৎ স্পিড মানির ঘাটতিতে কোথাও কোনো ফাইল নড়বে না। পুলিশ সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক উক্তি মনে রেখে বলা যাবে, পুলিশি কাজকর্ম থেমে যাবে, ফলে দিনটা চলে যাবে অপরাধীদের দখলে। কোনো সরকারি হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা বা ওষুধ পাবে না, যেহেতু সামান্য সেবা ও ওষুধ পেতে সেবাদাতার করতল তৈলাক্ত করতে হয়; সারা দেশে সরকারি নিয়োগ, টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাবে; বন্দরের মাল ওঠানামা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; ঢাকা শহরে ভোর রাতে ট্রাকে করে যেসব তরিতরকারি, ফলমূল, হাঁসমুরগি ইত্যাদি আসে সেসব উৎসে পড়ে রইবে; বিমানের আগের দিনের ফ্লাইটটি ওই দিনও আর আকাশে উড়বে না। অবশ্য বিমানের যাত্রীদের জন্য এটি কোনো খবরই নয়। একসময় বাজারে একটি চুটকি খুব চলত: বিমানের প্রতিটি ফ্লাইট সময়মতো ছাড়ে—হ্যাঁ, গতকাল সকাল নয়টার ফ্লাইটটি আজ সকাল নয়টায় ছেড়েছে। সময়টা তো ঠিক রেখেছে। এখন লোকে বলে, বিমানের ফ্লাইট আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত কোনো একদিন উড়লেই যাত্রীরা উৎফুল্ল হয়, নিজের দেশের জাতীয় বিমান সংস্থা বলে কথা।
দেশটার তাহলে যা হবে তাকে পরিবহনের ভাষায় বলা যায় চাক্কা জ্যাম। এই জ্যামের ব্যাপকতা ওপরের মাত্র কয়েকটি উদাহরণ সঠিক তুলে ধরতে পারবে না, সম্ভবও নয়। তবে এর ফলে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হবে তা কল্পনা করতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকারি দলের টেন্ডার বাহিনী থেকে শুরু করে ভূমিদস্যুরা এতে মারাত্মক ক্ষিপ্ত হবে। যেখানেই টেবিলের নিচ দিয়ে—দুঃখিত, পড়ুন ওপর দিয়ে—খাম চালাচালি হয়, সেখানেই প্রত্যেকের মেজাজ খারাপ হবে। এমনকি পুরোনো গল্পের নিরীহ সেই ঢেউ গণনাকারীরও। আমি নিশ্চিত, সকাল শেষ হতে না-হতেই দিবসটির বিপক্ষে নানা জায়গা থেকে প্রতিরোধ সৃষ্টি হবে। আমি অবাক হব না, যদি দিবসটির প্রবর্তক বিশ্ব সংস্থাটির (বিশ্ব দিবসগুলোর জিম্মাদার কে, আমি জানি না) কাছে ওই দিন দুপুরের মধ্যেই ডলারভর্তি খাম পৌঁছে যায় দিবসটিকে বিশ্ব বর্ষপঞ্জি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য।
জনগণ সচেতন হতে হতে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়ালে কিছু একটা তো হয়ে যেতে পারে, নাকি? তৎপরতা হবে সে জন্য। তবে বাংলাদেশের চাক্কা জ্যাম যাতে না হয়, সে বিষয়টাও তো দেখতে হয়। আমরা যেহেতু বাংলাদেশে থাকি, যা আসলে আম (অর্থাৎ পাবলিক) জ্যামের দেশ বলে বিশ্বে বিখ্যাত, আমাদের পক্ষে সে বিলাস হবে আত্মঘাতী। ফলে আমরা বরং একটি সময় ও দেশোপযোগী প্রস্তাব দিতে পারি এবং তা হবে বিশ্ব দুর্নীতি দিবস পালন। তাহলে বিশ্বও খুশি হবে (বিশ্বে এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও দুর্নীতি ওকগাছের মতোই পোক্ত), আমরা তো বটেই। আমাদের রেলের কালো বিড়ালগুলো গোঁফে তা দেবে, হাসপাতালে রোগী একটা প্যারাসিটামল অন্তত পাবে, থানায় থানায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগ কিছুটা এদিক-সেদিক হতে থাকবে, টেন্ডারের কনটেন্ডাররা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে। এই একটি দিবস প্রতিবছর সাদা করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের জোগান দেবে, তাতে সামান্য ট্যাক্স লাগালেই আমাদের সামনের কোনো বাজেটেই আর ঘাটতি নিয়ে ভাবতে হবে না।
এ রকম একটা দিনের প্রস্তাব আমরা এখন তুলতেই পারি।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।