স্বৈরাচার এরশাদের কাকুতি-মিনতি!

খেতাবকর্তিত এরশাদ

ফারুক ওয়াসিফ | প্রথম আলো তারিখ: ২৮-০৬-২০১২

জাতীয় সংসদে এরশাদ সাহেব তাঁর ‘ভাইদের’ প্রতি আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আবেদন করি, ভাইরা, আমাকে স্বৈরাচার বলবেন না। মনে ব্যথা পাই, মনে দুঃখ পাই।’ বিখ্যাত টিভি সিরিয়াল সংশপ্তক নাটকের কানকাটা রমজানও ধনবান হয়ে একই রকম আক্ষেপ করেছিলেন। ‘স্ট্যাটাস’ বদলালে নামও বদলায়, স্ট্যাটাস বদলে এরশাদও স্বৈরশাসক থেকে ‘মাননীয় সাংসদ’ হয়েছেন। এখন তাঁর নাম বদল প্রয়োজন। গোস্সা করে সেটাই তিনি এলান করেছেন।
এরশাদ সর্বদাই অভিনব। ‘নতুন’ শব্দের প্রতি তাঁর বিস্তর মোহ। রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিবের ‘সোনার বাংলাদেশ’, রাষ্ট্রপতি জিয়ার ‘প্রথম বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে তিনি নিয়ে আসেন ‘নতুন বাংলাদেশ’ তত্ত্ব। এই তত্ত্ব যতই নতুন হোক, বাংলাদেশে তাঁর মতো একঘেয়ে পুরোনো পদার্থ আর কিছু নেই। সেই ১৯৮১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তাঁকে দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের। একঘেয়ে, বিরক্তিকর, পরিবর্তনহীন দীর্ঘ নয়টি বছর তিনি এই সিন্দাবাদের ভূতের মতো রাষ্ট্রের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ছিলেন। সদ্য কিশোর বাংলাদেশকে তিনি নয়টি বছর বাড়তে দেননি, তার খেসারত আজও আমাদের শুধতে হচ্ছে। যাত্রাপালার সঙের মতো নব নব রূপে আবির্ভূত হওয়ার অসাধারণ প্রতিভা তাঁর। সামরিক আইন প্রশাসক থেকে অনির্বাচিত-নির্বাচিত সব ধরনের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কবি খেতাব আদায় করেও থামেননি, রঙিলা প্রেমিকের ভড়ং চালিয়েছেন বহু বছর। প্রেমিকদের জন্য যে শক্তিবর্ধক মহৌষধ জরুরি, বাংলার দুর্বলপ্রাণ পুরুষকুলকে তিনি সেই মহার্ঘ বস্তুর খোঁজও দিয়েছেন।
কথায় আছে, যা বারোতে হয় না তা বাহাত্তরেও হয় না। এই প্রবাদও এরশাদের কাছে অসার। ৮২ বছর বয়সে আবার তাঁকে নতুনত্বের নেশায় পেয়েছে। ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে’ তাঁর এক দলীয় অনুচর তাঁকে আয়ু দান করার মহতী প্রস্তাব এনেছেন। স্বৈরাচারী এরশাদ নব-আয়ুযৌবনপ্রাপ্ত হয়ে এবার গণতান্ত্রিক হবেনই হবেন। কিংবদন্তির রসজ্ঞ গোপাল ভাঁড়ের পক্ষেও নিত্যনতুন ভাঁড়ামো করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। গোপালের পুরোনো মুখ আর পুরোনো ভাঁড়ামোয় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সাতিশয়বেজার হলেন। গোপাল থামবার পাত্র নন। ফন্দি অনুযায়ী রাস্তা থেকে একজন কুলি ভাড়া করা হলো। তারপর একটা বড় ধামায় চড়ে বসে হুকুম হলো, ‘চলো, আমাকে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে নিয়ে চলো’। সেই মোতাবেক গোপালসমেত ধামা মাথায় কুলি হাজির হলেন কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে। ধামায় বসা অতিকায় কুমড়ার মতো গোপালকে দেখে রাজার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। হাসি থামলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গোপাল, এ তোমার কী হলো?’ গোপালের গম্ভীর উত্তর, ‘মহারাজ, আজ এই আমার নতুন’। গোপাল বদলাননি, বদলেছে কেবল তাঁর বাহন। এরশাদ বদলাননি, বদলিয়েছেন ভাষা আর সম্ভাষণ। ‘প্রিয় দেশবাসী’ না বলে এখন বলছেন ‘ভাইরা’। সামরিক ফরমান জারির বদলে জাতির বিবেকের করুণকাঁদুনি গাইছেন। ক্ষমতার ভাষা ছেড়ে ধরেছেন আবেদন-নিবেদনের ভাষা। হায় বিধি! আমাদের এও জানতে হলো, মহাশয়ের একখানা স্পর্শকাতর মন আছে এবং তা ব্যথা-দুঃখ ইত্যাদি পায়।
দেশ শাসনের নয় বছরে কখনো মনের দোহাই তাঁকে দিতে হতো না, তিনি দেখাতেন ক্ষমতার নেহাই। কামারশালায় নেহাইয়ের ওপর লোহা রেখে যেমন হাতুড়িপেটা করা হয়, তাঁর আমলে দেশটা তেমন নেহাইপৃষ্ঠে শায়িত ছিল; ক্ষমতার হাতুড়ি পিটিয়ে তিনি দেশকে সোজা বা চ্যাপ্টা করে চালাতেন। দিন গুজার গিয়া। বারোঘাটের পানি খেয়ে এখন তিনি ন্যায়বান কাজি হয়েছেন। কোনো রাজনৈতিক ভায়াগ্রা সেবনেও তাঁর পক্ষে যেহেতু হারানো নেহাই বা হাতুড়ি কোনোটাই পাওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু তিনি মনে দুঃখ-ব্যথা পেতে শুরু করেছেন।
আমরা সবাই মন নিয়েই জন্ম নিই। এরশাদ সাহেব কিছুটা ব্যতিক্রম। শৈশবের কথা জানি না, কিন্তু ভরাযৌবনে যখন তাঁর দেশে ভয়াবহতম গণহত্যা চলছে, তখন তিনি তিনি ইয়াহিয়ার দেশে তবিয়ত বজায় রেখে চলছিলেন—তাঁর মন তখন দুঃখ-ব্যথা পায়নি। ক্ষমতা দখল করে দেশপতি হয়ে ব্যাটাগিরি ফলিয়েছেন, তখনো মনের দেখা তিনি পাননি। কীর্তিমান রাজাকার মাওলানা মান্নানকে মন্ত্রী করতেও তাঁর মন বা বিবেকে বাধেনি। জীবনের শেষলগ্নে এরশাদ মানহানিজনিত কারণে মনের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলেন। সদ্যোজাত এই মনের মুখে মধু বর্ষিত হোক।
বাঙালি দুঃখের দুঃখী হতে কার্পণ্য করে না। যেকোনো অক্ষমতায় কেঁদে দেওয়াই আমাদের জাতীয় লক্ষণ। কান্না এখানে নদীর মতো শতধারায় প্রবাহিত। কিন্তু এই ‘দুঃখের ধারার ভরা স্রোত’ এরশাদশাহির মসনদের খুঁটিতে মাথা খুঁড়ে মরেছে, তাঁর লৌহমনকে সিক্ত করতে পারেনি।
নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের ছাত্র-শ্রমিক-জনতা যে এরশাদকে আবর্জনায় ছুড়ে ফেলেছিলেন, বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনীতির ভায়াগ্রা তাঁকে আবার পুনর্জীবিত করেছে। এরশাদ বাংলাদেশের গণতন্ত্র সহ্য করেননি, কিন্তু বাংলাদেশের গণতন্ত্র তাঁকে সহ্য করেছে। মিসরীয়রা তাদের স্বৈরাচার হোসনি মোবারককে ক্ষমা করেনি, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে তাঁকে অভিনন্দন জানাবার লোকের অভাব হয় না। এক এরশাদকে তাই স্বৈরাচার বলে কী লাভ, যখন নির্বাচিত স্বৈরাচারেরা তাঁকে বরণ করেন, শরিক করেন, রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখেন?
আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার রাজপথে জয়নাল, জাফর, দিপালী সাহা, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেন, জেহাদ, ডা. মিলনসহ অজস্র হত্যাসংবাদ শুনে শুনে। গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে গুলিবর্ষণে নিহত ছাত্রদের ভেসে যাওয়া লাশের খবর পেয়ে আমরা কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। স্বৈরশাহির পুলিশি নির্যাতনে এক চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া ছাত্রনেতার অন্য চোখের আগুনের দিকে তাকাতে সাহস হতো না আমাদের। আমরা বড় হয়েছিলাম পটুয়া কামরুল হাসানের ‘বিশ্ববেহায়া’ চিত্রকর্মের অজস্র প্রতিলিপি দেখে দেখে, ফরহাদ মজহারের কবিতা ‘লে. জেনারেল ট্রাক’-এর আবৃত্তি শুনে শুনে। এত এত আত্মদান, ঘৃণার জ্বলুনি, শহীদদের প্রতি নিবেদিত এসব কবিতা তাহলে অর্থহীন? যৌবনের বাংলাদেশের নয়টি বছরের দুঃশাসন আর লুটপাট তাহলে মিথ্যা? সত্য শুধু এরশাদের মন আর সংসদীয় ভাইদের এরশাদ বরণ? তাহলে কি ১৯৮৩-এর হত্যাকাণ্ডের পরে সংগ্রামী ছাত্ররা ‘রক্তের স্রোত পেছনে গড়ায়না’ বলে যে সংকল্প নিয়েছিল, তা-ও বৃথা?
মানলাম, কিন্তু রাজকীয় স্বৈরাচার খেতাব কেড়ে নিয়ে এরশাদকে নিছক ‘সাংসদ’ বলে অপমান মহাজোটের বন্ধুরা করতে পারেন, আমরা কদাচ করিব না। রক্তের ধারা সামনেই এগোয়।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক। farukwasif@yahoo.com