বাঘ-মহিষের ক্রসফায়ারে পড়লো গাধা!

image

বিশ্বজিত যে একজন পথচারী এবং বিএনপির আইনজীবী সমিতির মিছিলের অংশ না সেটা কি ছাত্রলীগের ক্যাডাররা বুঝেনাই? নাকি ক্যাম্পাস থাইক্যা নিয়া আনা অস্ত্রগুলা কাজে লাগানোর জন্য রক্ত মাংসের একটা মানুষ দরকার ছিল? সরকারকেন্দ্রীক ৩টি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিশেষ করে তাদের ছাত্রসংগঠনের ক্যাডারদের জন্য বাংলা ছবির ভিলেনদের স্টাইলে কথা বলা বা মধ্যযুগীয় স্টাইলে হই হই ধর ধর বলে অন্ধের মত আক্রমন করা এবং ‘নেতা বা পুলিশ আমাকে কি বলবে, ছু!’ বলে প্রকাশ্যে পশুর মত করে লাথি-ঘুষি মেরে, রড-পাইপ দিয়ে পিটিয়ে, রামদা-চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কাউকে মেরে ফেলা খুব সোজা। ‘ঠেকাতে গেলে আমাকেই মারবে’ এই ভেবে অনেকেই সামনে যাননি, দেখেছেন শুধু আর হা-হুতাশ করেছেন। অবরোধ সত্বেও যারা কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তারা বাহাদুরশাহ পার্কের কাছে রবিবার থেমে গিয়েছিলেন। ধাওয়া-ধাওয়ির মধ্যে পালিয়েছেন অলিতে-গলিতে, আশেপাশের দোকানে বা বাসায় ঢুকেছেন বাঘ-মহিষের মারামারি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে। কোন মহিষ পাকড়াও করতে না পেরে বাঘের প্রেস্টিজে খুব লাগলো। যেসব গাধা রাস্তার আশেপাশে ছিল এবার তাদের উপর রাগটা ঝাড়লো। হ্যা, একটাকে বাগে পাওয়া গ্যাছে। রাস্তার পাশের ক্লিনিকের দোতলায় লুকিয়েছিল সে। সেখানে গিয়ে পিটিয়ে আর কুপিয়ে তাকে জখম করা হলো। দৌড়ে পালাতে গিয়ে নিচেই আবার অন্যদের সামনে। মহিষ শিকার করতে না পারার দু:খটা মিটলো অবশেষে। কয়েকজন সহমর্মী বিশ্বজিতকে পাশের হাসপাতালে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ছাত্রলীগের জানোয়ারগুলার তখন খুন চেপে গ্যাছে। আরও কিছুক্ষন মার খাওয়ার পর জীবন বাচাতে আবার দৌড় দেয়। কিন্তু পাশের গলিটার মুখে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। স্থানীয়দের সহায়তায় এক নাম না জানা রিকশাওয়ালা তাকে মিটফোর্ডে নিয়ে যান। সেখানে আবার পুলিশ আসেনি বলে ডাক্তাররা আইনী জটিলতার কারনে পরিচর্যা শুরু করতে দেরি করে। আর তার মধ্যেই মারা যান বিশ্বজিত। এক ঘন্টার এই ধকলের মধ্যে কয়েকবার সুযোগ নিয়েছিল সে। ওর জীবনীশক্তি খুব প্রখর। আহত অবস্থায় দুইবার সে পালিয়েছে। শেষবেলায় এসেও হয়ত হাসপাতালের ডাক্তাররা তালে বাচাতে পারতো। নাহ, সবাই ফেল মেরেছে! ঘটনার সময় পত্রিকা-টিভি-রেডিওর সংবাদকর্মীদের নীরব ভূমিকা আমাকে রুষ্ট করেছে। তারা সংবাদ সংগ্রহ করার কাজটা হয়তো করেছেন, কিন্তু একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে টিভি-পত্রিকার সাংবাদিকরা তো এগিয়ে যেতে পারতেন, জনগনকে নিয়ে ছাত্রলীগকে ধাওয়া করতে পারতেন। আর মানুষ হিসেবে তো বটেই। ছাত্রলীগ যখন বিএনপির আইনজীবী সমিতির মিছিলটিকে ধাওয়া করলো কি করছিলেন আপনারা তখন? ফুটপাতে বা চিপা গলিতে আশ্রয় নেয়া কর্মক্ষেত্রে রওনা হওয়া মানুষগুলোর সাথে রাস্তা থেকে নিরাপদ দূরত্বে ছিলেন? অফিসে পাঠানোর মত খবরের অপেক্ষায় ছিলেন? বিশ্বজিতকে যখন ক্লিনিকের দোতলা থেকে টেনে নামাচ্ছিলো জল্লাদরা তখন আপনার ক্যামন লাগছিল? দৌড়ে নীচে নেমে যখন সে আবার কতগুলা হায়েনাদের মুখে পড়লো তখন? যখন ওকে বিষাক্ত সাপ মারার মত করে পেটাচ্ছিল কুপাচ্ছিল জানোয়ারগুলা, তখন কিভাবে দৃশ্যটি দেখছিলেন আপনি? ক্যামেরাম্যানরা ছবি তুলে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার আক্রমনকারীদের সনাক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছেন, তাই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। কিন্তু ঘটনাস্থলে থাকা প্রতিবেদকরা কেন চুপ ছিলেন? রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীও কি ছাত্রলীগের মত ভেবেছিল যে এই হালকা পাতলা শরীরের নিম্ন মধ্যবিত্ত চেহারার যুবকটি কোন বিএনপি বা জামায়াত-শিবির কর্মী? তাদের কারো কারো কি সাপ-মারার যজ্ঞে যোগ দেয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল? শেষমেষ যখন বিশ্বজিতকে নিয়ে একজন রিকশাওয়ালা হাসপাতাল যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ কি করছিল? আমি ব্যথিত হই, লজ্জায় আমার মাথা নত হয়, রাগে আমার গা জ্বলে যায়, বিশ্বজিত, তোমার মৃত্যু সবাই চেয়ে চেয়ে দেখেছে, টিভির ক্যামেরাম্যানরা রেকর্ড করেছে সেই দামী ফুটেজ, পত্রিকাগুলোতে সামনের পাতায় ছাপা হবে সেই অমানবিক ঘটনার ছবি — তার উদ্দেশ্য যাই হোক। ছাত্রলীগ বাপ-মাসহ গালি খাবে। তোমাকে ছাত্রলীগ মেরেছে তাই তুমি বিএনপিপন্থী বা ছাত্রদল। দলটির মুখপত্র তোমাকে সমর্থক বলে মর্যাদা (!) দিয়েছে। আবার ছাত্রলীগ বলছে যারা তোমাকে মেরেছে তারা কেউ ছাত্রলীগ করে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলবেন এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা, অন্য একজন বলবেন দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। খুনিরা হয়তো এতক্ষনে নিরাপদ কোন জায়গায় পালিয়ে গ্যাছে কেননা ওরা সরকারি দলের লোক। ওদের ছবি প্রকাশ হয়ে গ্যাছে, সেই সাংবাদিকদেরই কল্যানে। বাহাদুরশাহ পার্কের পাশে অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ শাখার পাগলা কুত্তা এরা — মো শাকিল, তাহসীন কাদের, শাওন, নূরে আলম লিমন, মাসুদ আলম নাহিদ ও ইমদাদুল এখিন পর্যন্ত সনাক্ত হয়েছে। এবার এদের কঠোর শাস্তি পেতে দেখতে চাই। এরা রাস্তায় নেমেছে কারন তাদের অভিভাবক আওয়ামী লীগ বলেছে পুলিশ আর তার দল বিরোধীদলের অবরোধ ঠেকাবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট এই কর্মসূচি দিয়েছে তত্বাবধায়ক সরকার পূন:প্রতিষ্ঠার দাবিতে, মতান্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে আসামীদের মুক্তির দাবি আদায় করতে। এরা সরকারকে বাধ্য করতে চায় দাবি মানতে। সরকার মানে বংগবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন সরকার যারা গত বছর সংবিধান সংশোধন করে তত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিয়েছে এবং তার আগের বছর যুদ্ধাপরাধের নাটের গুরুদের বিচার শুরু করেছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া (ও জামায়াত) তাদের যার যার বিশ্বাসে-দাবিতে অটল। তাই একদিকে আন্দোলন চলছে আরেকদিকে দমনপীড়ন চলছে যা এই দেশের ঐতিহ্যের একটি অংশ। কিন্তু, ‘কিসের মধ্যে কি? এইখানে বিশ্বজিত আসলো কোত্থেকে? এইটা আমাদের দুইজনের ব্যক্তিগত ও দলীয় বিষয়, তুই বাবা কেন গেছিলি রাস্তায়?’ — এটাই হয়তো ভাবছেন এখন দুই নেত্রী। পাগলা কুত্তাগুলা হয়তো বুঝতে পারছে তাদের টার্গেট ভুল ছিল। কিন্তু এখন তো টাইমওভার হয়ে গ্যাছে। আবার টাইমমেশিনও আবিষ্কার হয়নাই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত দর্শকরা, আর আমরা যারা রেডিও-টিভি-পত্রিকা-ইন্টারনেট দেখে জেনেছি তারা কেউ কেউ হয়তো এখন ভাবছেন ‘ইশ, আমি যদি সুপারম্যান হইতাম, সবগুলারে মাইরা বিশ্বজিতরে উদ্ধার করতাম।’ বাঘে-মহিষে তো আরো ধাওয়া-ধাওয়ি হবে সামনের দিনে। তখন বিশ্বজিতেরা কি করবে? খুন, দখল, লুটপাট, স্বার্থের রাজনীতি আর কতদিন?