শামীমা মিতু: বুখারী শরিফের সংকলনকারীদের কি চাপাতির নিচে পড়তে হয়েছে?

কোনও ব্লগার খুন হলেই চারপাশে দুটো কথা বেশি শোনা যায় আজকাল।
এক: যারা ব্লগারদের খুন করছে তারা সত্যিকারের ধার্মিক না, তারা জঙ্গি।
দুই: যুক্তিবাদী হতে হলে অন্যের অনুভূতিতে আঘাত হানতে হবে কেন? কেন ধর্মকে নিয়ে কটাক্ষ করতে হবে?

যারা খুন করছে তাদেরকে সত্যিকারের ধার্মিক ভাবছেন না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় গোপন করে রাখা দু-একটি আইডি থেকে ধর্ম বা নবীকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে, অথচ তাদেরকেই ভাবা হচ্ছে প্রকৃত ব্লগার বা নাস্তিক। যে আইডিগুলো থেকে নোংরামি করা হয় সেগুলো তো জামায়াত শিবিরেরও হতে পারে। যেভাবে ধর্ম অবমাননার ধোঁয়া তুলে কক্সবাজারের রামুতে হামলা চালিয়ে বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, ধর্ম মানতে নাস্তিকদের তো কেউ বাধ্য করছে না, তাহলে তারা কেন ধর্মের পেছনে লাগে? গ্রামের প্রান্তিক মানুষ যারা জানেই না ব্লগ কাকে বলে, ইন্টারনেট কাকে বলে তারাও এমন প্রশ্ন করে। আবার যাদেরকে আমরা প্রগতিশীল বলে জানি, এমন অনেকেও প্রায় একই রকম প্রশ্ন করেন। অথচ তারা অভিজিৎ রায়ের কিংবা অনন্ত বিজয় দাশের কিংবা ওয়াশিকুর বাবুর কোনও লেখাতে দেখাতে পারেন না যেখানে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা হয়েছে। যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক কিংবা ব্লগ লেখে এমন কেউ খুন হলেই সবাই ভাবছে, নিশ্চয় খুন হয়ে যাওয়া ব্যক্তিটি ধর্ম না হয় নবী-রাসুলকে নিয়ে কোনও কটূক্তি করেছে! সর্বসাধারণের কাছে এমন ভাবমূর্তিই তৈরি করা হচ্ছে।

অথচ একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে জড়ো হওয়া তরুণরা আল্লামা শফীর কাছে খেতাব পেয়েছিল ‘শাহবাগি নাস্তিক’ হিসেবে। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে প্রায় ১০ লাখ মানুষ জড়ো হয়েছিল, ওই ১০ লাখ মানুষের সবাই কি নাস্তিক?

প্রতিটি হত্যার বিচার নিয়ে রাষ্ট্র রহস্যময় আচরণ করছে। সরকার শুধু নির্বিকারই থাকছে না, বরং অচেনা বামনের পৈতা দেখানোর মতো নানা কূটকৌশল করছে। তালিকা ধরে একের পর এক হত্যা করা হচ্ছে ব্লগারদের, তাদের নামে বদনাম রটিয়ে খুন করার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করা হচ্ছে এবং হত্যার পর স্বগর্বে দায় স্বীকার করছে আল কায়েদার বাংলা সংগঠন। আল কায়েদার হাত যেখানে পড়ে সেখানকার অবস্থা কী হয়, আমাদের সামনে কি এর উদাহরণ নেই? আমরা কি দেখছি না সিরিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি? যারা ভাবছেন এইসব জঙ্গি সংগঠন দেশের কিছু নাস্তিক ব্লগার হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত দেবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন, তারাই দেশের ক্ষতি ডেকে আনছেন।

আনিস আলমগীর ঢাকা ট্রিবিউনে ‘সজীব ওয়াজেদ, জাফর ইকবাল এবং ‘স্পর্শকাতর’ ব্লগার ইস্যু’ শিরোনামে একটা কলাম লিখেছেন। লেখার কিছু জায়গায় কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন,‘কতিপয় ব্লগারের গালাগালি প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। আমরা সব ধরনের সংস্কার আন্দোলন করতে পারি, যুক্তি দিতে পারি কিন্তু অনুভূতিতে আঘাত কেন? আমাদের দর্শন চিন্তায় যুক্তি প্রদর্শনের চাইতে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতারা, তাদের ব্যক্তিচরিত্র নিয়ে কটাক্ষটা প্রাধান্য পাচ্ছে কেন? মুক্তচিন্তার কথা বলে আমরা গুটিকয় লোক কি সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিশ্বাসে অন্তরায় সৃষ্টি করছি? কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাসে আমাকে আঘাত দেওয়ার আগে তার প্রতিক্রিয়ার কথা কি আমরা ভাবছি?’

তার লেখা পড়ে মনে পড়ে গেল, বুখারী শরিফের অনেক হাদিস বহু বছর ধরে টিকে আছে যেগুলো পাঠ করলে নবীর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে। মুসলিম হাদিস বিশারদরা দাবি করেন, এসব হাদিস সবই মিথ্যা বা ফেইক। অথচ এই সকল হাদিস মুসলমানেরাই সংকলন করেছেন, সাহাবি-খলিফাদের বরাত দিয়ে। এটা কি ধর্মানুভূতিতে আঘাত নয়?  বুখারী শরিফের এই সংকলনকারীদের কি চাপাতির নিচে পড়তে হয়েছে?

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের দাবি হচ্ছে তারা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ অনুসরণ করে। অথচ এই সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধনের সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত ৭২-এর সংবিধানের মূলনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে এরশাদ আমলে করা ‘রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম’ বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে একটি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। একদিকে হেফাজতের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শফী হুজুরের পায়ে মাথা ঠোকেন।

এদেশে বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে ইসলামকে দাঁড় করানো হয়েছে। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান, গণজাগরণ মঞ্চকেও হেফাজত-জামায়াত নাস্তিক বলে আখ্যা দেয়। অথচ এদের একটা লেখা, একটা বক্তব্য পাওয়া যাবে না যাতে ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে।

বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় কিংবা অনন্ত বিজয় দাশের লেখা খুবই পরিচ্ছন্ন, যুক্তিপূর্ণ। তারা তো কাউকে গালিগালাজ করেননি, অশ্লীল উক্তিও করেননি কোনও লেখায়, এমনকি নির্দিষ্ট কোনও ধর্ম নিয়ে ধর্মবিদ্বেষী কোনও মন্তব্য করেননি। তারা খুন হলেন কেন?

যারা ধর্মীয় আচার-রীতি, বিধান প্রচার এবং ধর্ম রক্ষার দাবি করছেন, তারাও কিন্তু অনেক বেশি অশ্লীল, নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করছেন; মূলত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের লোকদের। শিবিরের বাঁশের কেল্লাসহ হেফাজতের নানা ফেসবুক পেজে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিশিষ্টজন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষের ব্লগার এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও ভয়াবহ, নোংরা অশ্লীল গালিগালাজ করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, ধর্মীয় চেতনার অধিকারী হলে তারা তাদের মত প্রকাশ করবে, যাকে ইচ্ছা নাস্তিক, মুরতাদ বলবে, অশ্লীলতম ভাষায় গালিগালাজ করার পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে, আর বিজ্ঞানমনস্ক কেউ তার যুক্তির বিপরীতে কোনও যুক্তি দিলে বলবে, ‘ওই ব্যাটা, চুপ থাক তোরে এসব নিয়ে লেখালোখি করতে কে বলেছে’, এরপর যুক্তিতে হেরে গেলে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে তাকে নৃশংসভাবে খুন করবে!

শুধু ব্লগার নয়, ধর্মীয় চিন্তাবিদদের মধ্যে যারা উদার দৃষ্টিসম্পন্ন, যারা জামায়াত-হেফাজত বিরোধী তাদেরও তো বাসায় ঢুকে নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। মাওলানা নূরুল ইসলাম ফারুকীর হত্যাকাণ্ড তো সেদিনের ঘটনা।

ধর্মানুভূতিই বা কী বস্তু, যাকে অনাহত, অক্ষত রাখার জন্যে রাষ্ট্রসহ নানান গোষ্ঠী এতো তৎপর? ধর্ম কি যুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ধার্মিকেরাই বিশ্বাসী হওয়ার কথা বলেন। কিসে বিশ্বাস? সেই বিশ্বাস, যা বহু আগেই বদলে দিয়েছেন কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন, আইনস্টাইনরা।

নানান বৈজ্ঞানিক সত্য আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়, পৃথিবী ও গ্রহগুলো ঘোরে সূর্যকে কেন্দ্র করে, মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে ‘বিগ ব্যাং’ বা মহাগর্জনের ফলে, সেটি হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি, আজ থেকে এক হাজার থেকে দু-হাজার কোটি বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে, তারপর থেকে সম্প্রসারিত হয়ে চলেছে, সূর্য আর গ্রহগুলো উদ্ভূত হয়েছে সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে, বিবর্তনের ফলে মানুষের বিকাশ বিশ থেকে চল্লিশ লাখ বছর আগে, পাহাড়গুলো পেরেক নয় ইত্যাদি।

একথাগুলো তো প্রচণ্ডভাবে আহত করে ধর্মানুভূতি, কেউ যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এ সব সত্যে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এগুলো নিষিদ্ধ করার দাবি জানায় তখন রাষ্ট্র কী করবে? রাষ্ট্র কি নিষিদ্ধ করবে বিজ্ঞান?

রাষ্ট্র যদি সত্যি মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরেপেক্ষ নীতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে রাষ্ট্রকে এ ধরনের নৃশংস খুনের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং জামায়াত-হেফাজত তোষণের দ্বৈতনীতি নিয়ে দেশ চালালে এ দেশের পরিণতি পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতোই হবে। আর এমন আশঙ্কাই দিন দিন তীব্র হচ্ছে!

লেখক: সাংবাদিক ও ব্লগার