‘আজ যেহেতু আপনি চুপ করে আছেন সেহেতু কাল নিজের বোনের ধর্ষনের খবর পাবার জন্য তৈরী থাকুন’

আমি আমার বোনের সাথে কখনো বাইরে যেতে চাইতামনা। চলতি পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ নামের জন্তুগুলো যেরকম বাজে ভাবে তাকিয়ে থাকতো আর নোংরা নোংরা সাইড কমেন্ট করতো তাতে করে আমার পিত্তি জ্বলে যেত। মনে হত ধরে নিয়ে থাপ্পর দিয়ে ভদ্রতাবোধটা শিখিয়ে দেই।

একবার আপুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেউ বাজে ভাবে তাকালে বা বাজে কমেন্ট করলে আমার খুব রাগ লাগে, মন খারাপ হয়ে যায়। তোর কি খারাপ লাগেনা? আপু বলেছিল, ‘আমার সেরেফ মরে যেতে ইচ্ছে করে!’

একটা মেয়ে সারাদিনে ঠিক কতবার শারীরিক বা মানষিকভাবে হেনস্থার শিকার হয় তা কেবল ঐ মেয়েটাই জানে। আমরা পুরুষরাতো নোংরা কথা বলেই খালাস। কিন্তু কতক্ষনই বা সহ্য করা যায়? কয়টা নোংরা কথাই বা সহ্য করা যায়? যদি উল্টোটা ঘটতো? যদি একটা ছেলে সারাদিনে একটা মেয়ের মত নোংরা কথার সম্মুখীন হত? কী হত তাহলে? আমি হলফ করে বলতে পারি একটা মেয়ে সারাদিনে যতবার যত পুরুষ দ্বারা শারীরিক ও মানষিকভাবে হেনস্তার শিকার হয় তার একশোভাগের দশ ভাগও যদি কোন পুরুষকে ভোগ করতে হত তাহলে তুলকালাম বেধে যেত।

আমাদের সমাজে একটা বিষয় খুব ভাল সয়ে গেছে। আমার কাছে আমার বোন মানে আমার বোন আর তোর বোন মানে একটা মাল। আর তোর কাছে তোর বোন মানে তোর বোন আর আমার বোনটা একটা মাল। আপনি ফ্রয়েড পড়ে নাক সিঁটকালেও পারলে ফ্রয়েডের তত্ত্বকেই সত্যি করবেন অবিরাম।

যন্ত্র সভ্যতা অনেক এগিয়েছে ঠিকই কিন্তু জন্তুর সভ্যতা বাড়েনি এক চুলও। এমনকি আমাদের শিক্ষিত সমাজের মানষিকতাও রয়ে গেছে জন্তু পর্যায়ে। একটা মেয়ে ধর্ষিত হলে আমাদের পত্রিকার শিরোনাম হয়

‘রাজধানীতে ষোড়শী ধর্ষিত’

‘মিরপুরে যুবতীকে রাতভর পালাক্রমে ধর্ষন’

‘দশজন মিলে গণধর্ষণ করল অষ্টাদশী নারীকে’

‘তরুণীকে দল বেঁধে ধর্ষণ’

আর সংবাদের ভিতরে থাকে ধর্ষণের রগরগে বর্ননা। আমাদের মানষিকতা বিকৃত হতে হতে ঠিক কোন পর্যায়ে চলে গেছে তা আমরা জানিনা। আমার এক কলিগের সাথে কথা হচ্ছিল। আমি জানতে চাইলাম ধর্ষনের মামলা পুলিশ নিতে চায়না কেন? কলিগ বলল, ধর্ষনের মামলায় টাকা খাবার সুযোগ কম, ঝামেলা বেশি। সে কারনে পুলিশও এড়ায় যায়।

গত বৃহস্পতিবার রাতে একজন নারীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে পাঁচজন যুবক মিলে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষিতা মেয়েটির বোন পাশের থানায় মামলা করতে গেলে তারা জানায় এটি তাদের এলাকার অন্তর্ভক্ত নয়। সেখান থেকে আবার তাদেরকে পাঠানো আরেকটি থানায়। এভাবে এক থানা থেকে আরেক থানা করতে করতে পরদিন শুক্রবার দুপুরে মামলা নথিভুক্ত করা হয়। কি অদ্ভূত!

ধর্ষিতা মেয়েটি গারো। পত্রিকাগুলো তাদের শিরোনামে মেয়েটির এই পরিচয়টি দিতে কার্পণ্য করেনি। যাতে করে আপনি মেয়েটিকে ধর্ষণের দৃশ্য কল্পনা করার সময় একটি গারো মেয়ের মুখাবয়ব মনে করে পূর্ণ আনন্দ নিতে পারেন। আরেকটি বিষয় হতে পারে, মেয়েটি যেহেতু গারো সেহেতু আপনার মাথা ব্যাথার কোন কারন নেই, সে আপনার সম্প্রদায়ের বা আপনার ধর্মের কেউনা। তাই আপনার প্রতিবাদ করতে হবেনা, আপনি ঘরে বসে মুড়ি খান।

কিন্তু জেনে রাখেন এভাবে আপনি যতদিন নিজের বোনকে সম্মান করে আগলে রাখবেন আর অন্যের বোনকে মাল ডাকবেন ততদিন আপনি জন্তু সভ্যতা থেকে বের হতে পারবেননা। আর একটি গারো মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে বলে আজ যেহেতু আপনি চুপ করে আছেন সেহেতু কাল আপনার নিজের বোনের ধর্ষনের খবর পাবার জন্য তৈরী থাকুন। জানেনতো, আপনার বোনটাও কারো না কারো চোখে মাল।