‘হুমায়ূন আহমেদের সহধর্মিনী, অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী নাট্য নির্দেশক মেহের আফরোজ শাওনের দিনরাত্রির খবর’

ফাতেমা আবেদীন

কলিংবেল বাজার সঙ্গে সঙ্গে একটা হুটোপুটির আওয়াজ পাওয়া গেল ঘরের ভেতর থেকে। কেউ একজন দৌঁড়ে এসে খুলতে চাইছে। দরজা খোলার পর দেখা গেল, মাথাভর্তি ঝাকড়া চুলের এক শিশু দরজা খুলতে চেষ্টা করছিল। অতিথি এলে সে খুব খুশি হয়। তাই সবার আগে দরজাটা তারই খুলতে ইচ্ছা হয়। ভেতরে উঁকি দিয়ে আরেক শিশুর দেখা পাওয়া গেল। খুব বিরস মনে তিনি একটা পরোটা খাওয়ার চেষ্টা করছেন। যেন না খেতে পারলেই বেঁচে যাবে।

এটি এক হরতালের দিন। দখিন হাওয়ায় লিফটের পাঁচে পা দিয়ে এমন দৃশ্যই দেখতে পাই আমরা। হরতালের দিনগুলো অনেকটা ছুটির দিনের মতো কাটে এ বাড়ির সদস্যদের। ও হ্যাঁ দখিন হাওয়া কার বাড়ি এটা কি বলে দিতে হবে? বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি এটা। প্রয়াত এই লেখকের বাড়িতেই আমরা হানা দিয়েছি। উদ্দেশ্য তার সহধর্মিনী, অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী নাট্য নির্দেশক মেহের আফরোজ শাওনের দিনরাত্রির খবর নেওয়া।

দখিন হাওয়াতে পা দিয়েই আমরা বুঝে যাই, ‘হুমায়ূন আহমেদ নেই’ কথাটা একদম মিথ্যা। তিনি আছেন,তার দুই সন্তান, অগণিত বই, বাড়ির দেয়ালের ঝুলানো চিত্রকর্ম, দরজার সামনে ঝোলানো মুখোশ, সব জায়গায় তার অবাধ বিচরণ,তার ছোঁয়া।

আমরা হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজতে খুঁজতে মেহের আফরোজ শাওন ভেতর রুম থেকে এসে  বসলেন। সকালবেলার স্নিগ্ধতা তার সারা চোখেমুখে। আমাদের বসতে বলে নিজের ছেলে দুটোর খোঁজ নিলেন। বড় ছেলে নিষাদকে পরাটা খাওয়া নিয়ে একটু শাসন করলেন।

 শাওনের দিনরাত্রি

হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর শাওনের দিনরাত্রি একদম বদলে গেছে। ছেলেবেলায় তিনি ছেলেমানুষি করার সুযোগ পাননি এখন নাকি তাই করছেন। ইচ্ছা হলো রাত জেগে সিনেমা দেখছেন। গান শুনছেন, বই পড়ছেন, কিংবা স্ক্রিপ্ট লিখছেন। এগুলোকে তিনি নাম দিয়েছেন ছেলেমানুষী। অনিদ্রাদেবীর সঙ্গে সখ্য তাই রাতটা প্রায়শই নির্ঘুম কাটে। নির্ঘুম রাতকে কাজে লাগানোর জন্য স্থাপত্যকলার নকশা, স্ক্রিপ্ট লেখা, ফিল্ম দেখা সব কাজ এই রাতেই হয়। তবে রাত যতই জাগেন না কেনও কাজের খাতিরে খুব ভোরে শাওনকে উঠতেই হয়। শ্যুটিং থাকলে তো কথাই নেই। ভোরবেলা উঠে ছুটতে হয়। সেখানে কোনও হেলাফেলা নয়।

মাঝে মাঝে নিষাদ নিনিতকে স্কুলে দিয়ে আসেন। লক্ষ্মী বাচ্চাদুটোও বেশ খুশী হয় যদি সকালে মা স্কুলে দিয়ে আসেন। দিয়ে ফিরে এসে নিজের কিছু কাজকর্ম নিয়ে বসেন। নইলে তিনবন্ধু মিলে যে আর্কিটেকচার ফার্ম দিয়েছেন সেখানে যান অথবা সাইটে কাজ দেখতে যান। এর মধ্যেই চলে নিত্যদিনকার খাওয়া দাওয়া গোছগাছ সবকিছু।

ডেইলি রুটিন জানতে চাইলে হেসে ফেললেন শাওন। তার সেই অর্থে রুটিন নেই তবে এলোমেলো অগোছালো আচরণও নেই। একেকদিন একেকরকম কাটে তার। কোনওদিন সারাদিন কাটিয়ে দেন ছেলেদের সঙ্গে খুনসুটি করে কখনও বই পড়ে। আগেই বলেছিলেন, ছেলেবেলায় যে ছেলেমানুষিগুলো করা হয়নি সেগুলোই এখন চুটিয়ে করে নিচ্ছেন। দিনগুলো কাটুক অলস কিইবা এসে যায় তাতে। তবে নিজে যত অনিয়ম করুন না কেনও ছেলেদের বিষয়ে ভীষণ কড়া মা শাওন।

ছেলেদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য তাকে সহায়তা করেন নীলা। নিষাদ নিনিতও নীলাকে বেশ পছন্দ করে। তবে মায়ের সান্নিধ্য পেলে দুই ছেলেকে আর পায় কে। বিশেষ করে নিষাদ মায়ের একদম ন্যাওটা। বাবা চলে যাওয়ার পর মাকে ঘিরেই সবসময় থাকতে চায় ছোট্ট নিষাদ। যদিও মা মনে করেন নিষাদ অনেক বড় হয়ে গেছে। এই পরিবারের বড় ছেলে এখন সে,সব দায়িত্বও তার।

কথায় কথায় শাওন বললেন, বাইরে ঘোরাঘুরি একদম কমে গেছে। মাঝে মাঝে ছেলেদের সঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া হয়, সেটাও খুব কম। কাজ না থাকলে তিনি একদমই বের হতে চান না। দখিন হাওয়াতেই নিষাদ নিনিত আর তাদের প্রিয় পাঁচতলার চাচী,পাশের বাসার চাচী ও খেলার সাথীদের সঙ্গে কেটে যায়। এছাড়া ছুটির দিনগুলোতে তো সমবয়সী খালাতো-মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গ আছেই।

রাঁধুনী শাওন

সমঝদার না থাকলে নাকি রান্না করা হয় না। ছেলেবেলায় পড়াশোনা, নাচ, গান, অভিনয় নানা চাপে তার রান্না করা হয়ে ওঠেনি। জীবনে প্রথম ডাল রান্না করা হয়েছিল হুমায়ূন আহমেদের সংসারে এসে। এই কীর্তিমান লেখক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক ও নাট্য নির্দেশককে খুশী করতেই তিনি ডাল রান্না করেছিলেন। এরপর তো তার পছন্দের সব রান্না শিখে নিয়েছিলেন। হুমায়ূন আহমেদ যা যা খেতে পছন্দ করতে সব রান্না করতেন। নুহাশ পল্লীতে বা বাসায় যেই রান্না করুক না কেনও একটা আইটেম শাওনের রান্না করা থাকতেই হবে। শাওনও বেশ যত্ন নিয়ে রান্না করতেন। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর প্রায় দুবছর কোনও রান্না করেননি শাওন।

পরে আস্তে আস্তে নিষাদের দাবিতে ফিরেছেন রান্না ঘরে। নিষাদ নাকি বেশ সমঝদারের মতো বলে, মা নিউইয়র্কে থাকার সময় যে পাস্তাটা রান্না করতে,লবস্টার করতে ওটা এখন করো না। এই সমঝদার ভোজনরসিকের আব্দারেই শাওন এখন রান্নাঘরে ঢোকেন। সাধারণ তিন বেলার খাবার তো রান্নার লোকই করে শাওন করেন স্পেশাল আইটেমগুলো।

কঠিন কাজ

শাওনের জন্য কঠিন কাজ নাকি ছবি আঁকা। প্র্যাক্টিক্যাল খাতা আর স্থাপত্যকলার বাইরে কোনওদিন পেন্সিল ধরার সাহস করে উঠতে পারেননি শাওন। এই কাজটা বেশ কঠিন লাগে তার। বললেন পৃথিবীর তাবৎ কাজের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ। কি করে রং একটি ক্যানভাসে ছবি তৈরি করে এটি নাকি বিস্ময়ই। এর পর কঠিন কাজ ফিকশন লেখা। ও হ্যা কবিতা লেখাও নাকি বেশ কঠিন শাওনের কাছে। তবে স্ক্রিপটিং করে বেশ আনন্দ পান। গেলবার দেশের শীর্ষ এক দৈনিকের ঈদসংখ্যার জন্য একটি গল্পও লিখে ফেলেছিলেন। লেখালেখি কঠিন বললেও সহজ কাজের তালিকায় কিন্তু শাওনের লেখালেখিটাই রয়ে গেছে। নিষাদ নিনিতের সারাদিনের কাণ্ড বা টুকটাক ভালো লাগার গল্পগুলো ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখাটা নাকি একদম কঠিন নয়। বলা তো যায় না একদিন এই লেখা দিয়ে উপন্যাস রচিত হবে।

নিষাদ, নিনিতের মা শাওন

ইদানিং শাওনের সব পরিচয় ছাপিয়ে মা পরিচয়টিই প্রকট। যেকোনও অনুষ্ঠানে দুই ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া। ওদের সঙ্গে বেশিরভাগ সময় কাটানো, সবমিলিয়ে সন্তানময় সময় তার। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিনিত তার খাবারের বাটিটা নিয়ে হাজির। অর্থাৎ খাইয়ে দিতে হবে মাকে। নিনিতকে কোলে বসিয়ে খাইয়ে দিতে শুরু করলেন। তারপর শুরু করলেন, দুই ছেলের গল্প। একদম জেদি নয় এই বাচ্চাদুটো। নিষাদ খুব ইন্ট্রোভার্ট নিজের ভেতরে গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করে আর একমাত্র চাওয়া মায়ের সান্নিধ্য। নিনিত আবার বেশ আমুদে একদম বাবার মতো। তার সব কাজ সবাইকে দেখাতে চায়, অতিথি আসলে আপ্যায়নের ভারটাও নিনিত নিজেই নিয়ে নেয়। লেগো দিয়ে খেলনা বানিয়ে অতিথির দৃষ্টি আকর্ষণ কিংবা মায়ের কিছু লাগলে ছুটে গিয়ে করার চেষ্টা সবই নিনিত করে।

তবে দুটো ছেলের একজনও জেদি নয় বলে জানালেন শাওন। চাহিদাটাও নাকি একদম নেই। ছোটো বাচ্চাদের যেসব অহেতুক আবদার থাকে সেটাও তাদের দুজনের নেই।

শাওন নিজে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন ওদের বই পড়ে শোনাতে। বন্দুক বা অন্যান্য খেলনার চেয়ে বই কিনে দেন বেশি। এর পর দুই ভাইকে বই পড়ে শোনান ঘুমানোর আগে। আর ওদের সঙ্গে কম্পিউটার গেমস খেলতেও ভীষণ আনন্দ পান।  ওদের সঙ্গে খেলেন স্পোর গেমস, ব্যাটম্যানসহ নানা গেমস। তবে ধ্বংসাত্মক খেলা একদম খেলতে দিতে চান না। এমনকি দীর্ঘদিন দুইভাইয়ের কোনও খেলনা বন্দুক ছিল না।

নিনিতের প্রিয় খেলা লেগো দিয়ে বাড়িঘর তৈরি। নিষাদ কম্পিউটার গেমস পছন্দ করে বেশি। ইতোমধ্যে একবার অভিযোগ করেছে মায়ের কাছে নিনিত নাকি তার সব গেমস উল্টাপাল্টা করে দিয়েছে। তবে ভাইয়ের প্রতি যত অভিযোগই থাকুক না কেন ভাইকে আগলেও রাখে নিষাদই।

পাশের জায়গাটা বাবার

ছবি তোলার কথা বলতেই শাওন দুই ছেলেকে ডেকে নিলেন। নিষাদ-নিনিতও মায়ের সঙ্গে নানা ভঙিমায় পোজ দিচ্ছে। যদিও নিষাদ একদমই ছবি তুলতে চায় না। তবু মায়ের নির্দেশ অমান্য নয়। ছবি তোলার সময় শাওন  এক রহস্যের কথা জানালেন। বললেন, ছবি তোলার সময় নিষাদ সবসময় পাশের জায়গাটা বাবার জন্য রাখে। আমিও খেয়াল করলাম দরজায় দাঁড়িয়ে মায়ের সঙ্গে ছবি তোলার সময়  একটা বিশাল ফাঁকা জায়গা রেখে দুইভাই  দাঁড়িয়েছে। সোফায় বসে ছবি তোলার সময়ও পাশের চেয়ারটা ফাঁকা। নিষাদের বিশ্বাস বাবা এখানেই আছে। সত্যিই তো আমাদের চারপাশেই আছেন হুমায়ূন আহমেদ। মেহের আফরোজ শাওন,নিষাদ হুমায়ূন,নিনিত হুমায়ূন ও দখিন হাওয়ার চারপাশে তো রয়েছেনই বাংলাদেশের অগণিত মানুষের হৃদয়ে চিরআসন তার। তিনি আছেন সবসময়ের জন্য। তাই শাওনের ভাষ্যমতে তার সবগল্পগুলোই হুমায়ূন আহমেদের…

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন।