জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণার কারণে পেট্রলবোমা হামলা

সরকার যখন মনে করবে, তখনই জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করার বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে—আইনমন্ত্রীর এমন কথার পরই কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলা চালানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সাজ্জাদ হোসেনের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে জামায়াতের কর্মী আবদুর রাজ্জাক (৩৫) এসব কথা বলেন।

গত মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সংলগ্ন কাঠেরপুল এলাকায় ঢাকা থেকে রাঙামাটিগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসে পেট্রলবোমা ছোড়া হয়। এতে সাতজন দগ্ধ হন। এ ঘটনায় ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনের নামে মামলা হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক ওই মামলার অন্যতম আসামি।
গতকাল বুধবার রাতে আবদুর রাজ্জাককে চান্দিনার বাগুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। আবদুর রাজ্জাকের বাড়ি নোয়াখালী জেলার সুধারাম উপজেলার উত্তর শোলাকিয়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে।

১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে আবদুর রাজ্জাক আদালতে জানান, দুই বছর আগে বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে তিনি চান্দিনায় এসে বাগুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি মেসে ভাড়ায় ওঠেন। ওই সময়ে তিনি ঋণগ্রস্ত ছিলেন। চান্দিনা এলাকার জামায়াত-শিবিরের কিছু নেতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তখন তাঁরা রাজ্জাককে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হতে বলেন। রাজ্জাক তাঁদের বলেন, তিনি ঋণগ্রস্ত। এ মুহূর্তে রাজনীতিতে জড়াবেন না। তখন জামায়াতের কর্মীরা রাজ্জাকের ঋণ পরিশোধ করে দেন। এরপর থেকে তিনি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। তিনি জামায়াতের কর্মী বলেও ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বলেছেন।
আদালতে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘গত ১ জুন সংসদে আইনমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করার বিল সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন। সরকার জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। এ কারণে এরপর দিন মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে চান্দিনা ও দেবীদ্বারের কয়েকজন জামায়াত নেতার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। তাঁরা আমাকে রাতে এক জায়গায় ডাকেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার দিন মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে সাত থেকে আটজন জামায়াত-শিবিরের কর্মী বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উত্তরপাশের পুকুরের দক্ষিণ প্রান্তে মিলিত হই। এরপর দলের দুজন সক্রিয় কর্মী বাসের মধ্যে পেট্রলবোমা ছোড়ে। এরপর আমরা দৌড়ে কিছু দুর গিয়ে মানুষের সঙ্গে মিশে যাই। আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণার কারণে ওই পেট্রলবোমা হামলা করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার শাহ মো. আবিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শুরু থেকেই আমরা এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছি। আদালতে দেওয়া আবদুর রাজ্জাকের জবানবন্দিতে সেটি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলো। তদন্তের স্বার্থে পেট্রলবোমা ছোড়া দুই ব্যক্তির নাম এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

জামায়াত নেতাসহ সাতজন গ্রেপ্তার

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কাঠেরপুল এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের সাতজন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় গত বুধবার রাতে চান্দিনা থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।
এই মামলার আসামিরা জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামি হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার রােত ঢাকা থেকে রাঙামাটিগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসে ছোড়া পেট্রলবোমায় সাতজন দগ্ধ হন। পাঁচজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
চান্দিনা থানার পুলিশ জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন চান্দিনা উপজেলা জামায়াতের আমির আবুল বাশার, দেবীদ্বার উপজেলার বরকামতা ইউনিয়ন জামায়াতের আমির রফিকুল ইসলাম, জামায়াতের কর্মী চান্দিনার করতলা গ্রামের ওবায়দুল্লাহ, তাঁর ভাই মহিবুল্লাহ, একই গ্রামের ওমর ফারুক, নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার উত্তর শোলাকিয়া গ্রামের আবদুর রাজ্জাক ও চান্দিনা উপজেলার জামিরাপাড়া গ্রামের মো. নয়ন।
চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রসুল আহমদ নিজামী জানান, পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত শেষে বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) প্রবীর কুমার রায় মামলা করেন। বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনকে ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। এজাহারে নাম থাকা অন্য আটজনও জামায়াত-শিবিরের কর্মী। ওসি আরও জানান, গ্রেপ্তার হওয়া সাতজনকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মো. আবিদ হোসেন গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে জামায়াত-শিবির জড়িত। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জামায়াতের তিনজন নেতা আছেন। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।’ এসপি জানান, কুমিল্লায় এর আগে পেট্রলবোমা হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেই ঘটনায় করা মামলা পর্যালোচনা করার জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) জাহাঙ্গীর হোসেনকে।
এদিকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোল বলেন, পেট্রলবোমা হামলার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে ওই ঘটনা ঘটেছে, তা অনুসন্ধানের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মুহাম্মদ গোলামুর রহমানকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটি গঠন করা হয়।

৭ মার্চ একই স্থানে একই পরিবহনের বাসে হামলা হয়: কুমিল্লার কাঠেরপুল এলাকায় চলতি বছরের ৭ মার্চ রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ইউনিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে তিনটি পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও বাসটি পুড়ে যায়।
ওই ঘটনায় করা মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। চান্দিনা থানার ওসি রসুল আহমদ নিজামী বলেন, ওই মামলার অভিযোগপত্র শিগগিরই দেওয়া হবে।