ধর্ষীতার আতংক শেষ হয় না

স্ট্যাটাসটা পড়ে মূল ঘটনাটা যা বুঝলাম তা হলো- মেয়েটা ছোটবেলায় রেইপড হয়েছিলো। বড়বেলায় মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। সুখের সংসার।

কিন্তু মেয়েটার মনের ভিতর খচখচানি, যেহেতু তার ছোটবেলার এত ভয়ংকর ঘটনা তার জামাই জানেনা।
অবশেষে মেয়েটা তার জামাইকে বলেই দিলো।
ব্যাস, একটা রেইপড মেয়ের শরীর আমাদের সমাজে কুকুরের আইট্টা খাবারের মত। আমি শিউর সে জামাই সাথে সাথে চরম ডিসগাষ্টেড হয়েছিলো মেয়েটার প্রতি।
যা হওয়ার তাই হলো।
সংসার ভাংগলো।
ডিভোর্স।
.

ঘটনাটা এক্সেপশনাল কিছু না।
বাংলাদেশের মেয়েদের উপর অনার্স-মাষ্টার্স আর পিএইচডির মোট দশ বছরের গবেষনায় যা ব্যক্তিগতভাবে বুঝেছি, তা হলো- বাংলাদেশে ছোটবেলায় বা কিশোরীবেলায় হয় রেইপড অথবা টু-আ-ডিগ্রী ফিজিক্যালি হ্যারাসড হয়নি, এমন মেয়ে খুঁজে পাওয়া খড়ের গাঁদায় সুঁচ খুঁজে পাওয়ার মত।
.

বাকী সব ঘটনার সাথে এই ঘটনার একমাত্র পার্থক্য হলো, মেয়েটা সৎ এবং চরম সাহসী।
একটা মিথ্যার উপর সুখের সংসার ভোগ করার চেয়ে সে সত্য বলে ঘর হারানোর রিষ্ক নিয়েছে। আর কে না জানে, বাংলাদেশের কনটেক্সটে একটা মেয়ে ঘর হারানো মানে সব হারানো।
.

এই ঘটনা নিয়ে লেখারও কিছু ছিলোনা।
কিন্তু স্ট্যাটাসটার কমেন্টসগুলো যখন পড়ছিলাম, আরেকটা রিয়েলাইজেশান নতুন করে ফিরে এলো।
রিয়েলাইজেশানটা খুব blatantly বলতে হলে বলতে হয়- আমাদের সমাজে ডানপন্থী ইসলামিষ্টরা human psychology’র গুরুত্ব এবং প্রতিটা ব্যক্তির জীবনে তার psychology’র গুরুত্ব এবং প্রভাব সম্পর্কে শুধু অজ্ঞই না, চরম অজ্ঞ।
.

এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। Human psychology ইসলামিষ্টদের কাছে sciences’র অন্যান্য ব্রাঞ্চের মতই।
উনাদের কাছে science ঠিক ততটুকুই দরকার যতটুকু দিয়ে উনারা কোরানের আয়াতকে সত্য প্রমান করতে পারবেন।
এজন্যেই sciences নিয়ে পড়ালেখায় বাংলাদেশী ইসলামিষ্টদের ‘ইন জেনারেল’ দৌঁড় ড. মরিস বুকাইলি’র The Qur’an, The Bible & Sciences এই বই পর্যন্তই।
অথবা পৃথিবীর কোন কোণায় কোন ইহুদী-নাসারা সাইন্টীষ্ট ইসলাম গ্রহন করেছেন, তাতেই ইসলাম যে কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত একটা ধর্ম হয়ে গেছে তা প্রমান করা পর্যন্তই।
.

যেহেতু স্ট্যাটাসটা ডানপন্থী একজনের লেখা, ডানপন্থী ইসলামিষ্টদের কমেন্টসগুলো পড়ে মূল দু’টো বিষয় খুব ইন্টারেষ্টিং লাগলো।

এক- মেয়েটার উচিত হয়নি তার জামাইকে রেইপের ঘটনাটা বলা। কেনো উচিত হয়নি তা আবার অনেকেই হাদীস এবং কোরান দিয়ে প্রমান করতে চেষ্টা করলেন।

দুই- “আল্লাহ যেন মেয়েটাকে মাফ করে দেন”।
.

যারা human psychology’র নূন্যতম জ্ঞানও রাখেন, তারাও বলতে পারবেন, একটা মেয়ে যখন রেইপড হয়, তার পরবর্তী পুরো জীবনটা ঐ একটা ঘটনার সাথে মাকড়সার জালের মত গিট্টু লেগে যায়।
মাকড়সার জাল যেমন ছিঁড়ে না ফেলে জালটাকে অক্ষত রেখে গিট্টূ খোলার কোনো উপায় নেই, মেয়েটাও মরে না যাওয়া পর্যন্ত ঐ একটা ঘটনাকে কিছুতেই তার কনশান্স এবং সাবকনশান্স চিন্তা-ভাবনা, জীবন-বোধ থেকে erase বা delete করে ফেলার কোনো উপায় নেই।
.

শুধু তাই না, মেয়েটা যদি সময়মত প্রপার PTSD (Post traumatic stress disorder) ট্রীটমেন্ট না পায়, তাহলে খুব সামান্য, খুবই খুবই খুবই সামান্য কারনেও মেয়েটার ভিতর পুরো রেইপড হওয়ার ঘটনার মেন্টাল এবং ফিজিক্যাল পেইন ফেরত আসতে পারে।
.

স্রেফ পত্রিকায় একটা রেইপড হওয়ার ঘটনা, বা কোনো মুভিতে রেইপড হওয়ার দৃশ্য, বা কেউ রেইপড হয়েছে এমন শোনা – এগুলো খুব কমন ফ্যাক্টর ঐ মেন্টাল বা ফিজিক্যাল পেইন ফেরত আসার জন্য।
.

তবে বিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে আরো কমন একটা ফ্যাক্টর হলো- হয়তো তার ঐ মুহুর্তে তার জামাই’র সাথে ফিজিক্যাল রিলেশানশীপের মুড নেই। কিন্তু জামাই চাচ্ছে।
স্রেফ এই এতটুকু পুশই যথেষ্ঠ।
পুরো ফিজিক্যাল রিলেশানশীপটাই তখন তার কাছে সেই পুরাতন রেইপের পূনরাবৃত্তি মনে হবে।
এবং পুরো পোষ্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস আবার নতুন করে ফেরত আসবে।
জামাই বেচারার সামান্যতম ক্লু’ও থাকবেনা কেনো তার বউ এমন weird ব্যবহার করছে হঠাৎ করে!
.

আরেকটা উদাহরন হতে পারে, বাচ্চা হওয়ার সময় যখন একটা মেয়ের শরীরে ডাক্তারদেরকে অনেক close examination করতে হয়।
ডাক্তার যদি না জানেন মেয়েটা একসময় রেইপড হয়েছিলো, ডাক্তার অবশ্যই যে এক্সটা সতর্কতার দরকার তা নিবেন না। ফলে ডাক্তারের খুব নরমাল একটা ব্যবহারেও মেয়েটাকে চরম রকমের মেন্টাল বা ফিজিক্যাল পেইনের ভিতর দিয়ে যেতে হতে পারে।
.

বাস্তব একটা উদাহরন দেই।
ইন্টারপ্রিটিং করার সময় এন্টিনাটাল ক্লিনিকে একজন বাংগালী সন্তান সম্ভবা মেয়ের এপয়ন্টমেন্টে থাকতে হয়েছিলো।
আমি পর্দার ওপাশে দাঁড়ানো। ডাক্তার যা বলছে বাংলা করে দিচ্ছি। মেয়েটা যা বলছে ইংলিশ করে দিচ্ছি।
মেয়েটাকে যতই ডাক্তার বলছে পা ফাঁক করতে, মেয়েটা পা ফাঁক করছে ঠিকই কিন্তু পুরো শরীর চরম শক্ত করে রেখেছে।
ডাক্তার বার বার বলছে শরীর ছেড়ে দিতে।
মেয়েটা পারছেই না।
এক পর্যায়ে মেয়েটা কান্না শুরু করলো। এতটাই স্ট্রেসড মেয়েটা, আমি যেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত, আমাকে পর্দা সরিয়ে মেয়েটা ডাকতে লাগলো।
ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে আপু? আপনি ডাক্তারকে দেখতে না দিলে তো ডাক্তার বাচ্চার পজিশন বুঝতে পারবেনা।
মেয়েটা আমার হাত ধরার সাথে সাথে দেখি মেয়েটার শুধু হাঁত না, পুরো শরীর কাঁপছে।
কাঁদতে কাঁদতে মেয়েটা যা বললো, আমি আর ডাক্তার দু’জনেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
.

মেয়েটা ছোটবেলায় রেইপড হয়েছিলো। কালপ্রিট তার আপন চাচা। একবার না। কয়েক বার।
তার মা জেনেও কিছু করেনি। কারন ঐ চাচাই সংসার দেখাশোনা করে।
এখন ডাক্তার যখন তাকে পা ফাঁক করতে বলছে, তার ঐ ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে।
সে চাইলেও কিছুতেই শরীর নরম করতে পারছেনা।
.

ডাক্তার বার বার মেয়েটার কাছে মাফ চাচ্ছিলো।
এখানকার ডাক্তাররা এসব ব্যপারে খুবই সেনসিটিভ। সাথে সাথে ফোন করে এন্টিনাটাল ক্লিনিকে যারা মেয়েটাকে প্রাইমারী এক্সামিনেশান করেছিলো, তারা কেনো এই ইনফরমেশান ডাক্তারকে আগে দেয়নি, তাই নিয়ে হুলুস্থুল লেগে গেলো।
কিন্তু সমস্যা হলো মেয়েটা এই পর্যন্ত এই ঘটনা কাউকেই বলেনি।
উলটা মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে রিকোয়েষ্ট করতে লাগলো, বাইরে বসে থাকা তার জামাইকে যেন এসবের কিছুই বলা না হয়।
.

একজন রিসার্চারের একটা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। উনার গবেষনার মূল বিষয় ছিলো মেয়েরা কীভাবে আফটার রেইপড বাস্তবতার সাথে ডীল করে।
উনার একটা কথা জীবনেও ভুলবোনা।
কথাটা ছিলো- একটা মেয়ে রেইপড হওয়ার পর ঘটনাটা ওখানেই শেষ হয়ে যায়না। পরবর্তীতে মেয়েটার পুরোটা জীবন ধরে ঐ মেয়েটা বার বার রেইপড হয়। তাকে সবচে’ বেশী কেয়ার করে যারা, যেমন বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্মীয়স্বজন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তারাও না জেনে, না বুঝে, মেয়েটাকে রেইপ করে, বিভিন্নরকম ছোট-বড় পুশ আপ্স’র মাধ্যমে। Its a continuous virtual repetition of that past rape that the girl goes through for her entire life.
.

জামাই থেকে এ ধরনের ঘটনা লুকানো মানে, শুধু মেয়েটা একলাই সাফার করা না, জামাইটাও সাফার করা।
কারন বউ’র অনেক ব্যবহারই তখন জামাই’র কাছে শুধু দূর্বোধ্যই মনে হবেনা, চরম বিরক্তিকর ঠেকবে।
যা কিনা উলটা মেয়েটার সাফারিংসকে আরো বাড়িয়েই দিবে, কমাবেনা।
.

কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়, ঐ যে, আমাদের সমাজে একটা রেইপড মেয়ের শরীর কুকুরের আইট্টা/ ঝুটা করে রেখে যাওয়া খাবারের মত।
এর ব্যতিক্রম ভাবে, এমন ছেলে যে নাই তা না।
কিন্তু খুবই কম।
আর ডানপন্থী ইসলামিষ্টদের মধ্যে তো আরো কম। যারা কিনা উলটা ভাবতে বসে যায়, মেয়েটার তার জামাইকে জানানোটা কতটা “ইসলামসম্মত” হয়েছে!!!!
.

আর দ্বিতীয় বিষয়টা “আল্লাহ যেন মেয়েটাকে মাফ করে দেন”, তা নিয়ে আর কথা নাইইবা বললাম।
আমি বরং দোয়া করি, আল্লাহ যেন এসব অজ্ঞ, মূর্খ ডানপন্থী ইসলামিষ্টদের মাফ করে দেন। জীবনেও যেন এদের হাতে ক্ষমতা না দেন।
এরাই হলো তারা, যারা ক্ষমতা পেলে, যখন কোনো মেয়ে রেইপড হয়ে পুলিশে কমপ্লেইন করতে গেলে, উলটা রেইপের সময় চারজন সাক্ষী না পাওয়ার অপরাধে উলটা ঐ মেয়েকেই পাথর মেরে মেরে ফেলবে।
আল্লাহ মেয়েদেরকে রক্ষা করুন এদের হাত থেকে।

Written by Farjana Mahbuba