যৌন নির্যাতনঃ পহেলা বৈশাখ ও আমাদের রক্ষকরা

and we say nothingপ্রথম আলোর এই রিপোর্টটি ভয়ংকর সব তথ্য দিচ্ছে।

বাংলা বর্ষবরণের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় পুলিশকে দোষারোপ করেছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি। তাদের দাবি, ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরামর্শ অনুসারে পুলিশ প্রশাসন দায়িত্ব পালন না করায় ওই ঘটনা ঘটেছে।
হাইকোর্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে এ মন্তব্য করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটি ওই ঘটনার তদন্ত করে।
বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ১৬ এপ্রিল স্বতঃপ্রণোদিত আদেশে পয়লা বৈশাখে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা তদন্ত করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পৃথক প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনজীবী এ এফ এম মেজবাহউদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস। এ বিষয়ে ৭ জুলাই পরবর্তী আদেশের দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আইজিপির পক্ষ থেকে গত ১৮ মে হাইকোর্টে ওই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত কমিটি গঠন এবং শাহবাগ থানায় মামলা করেছে। এ ছাড়া পুলিশের কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৯ এপ্রিল গঠিত পুলিশের তদন্ত কমিটি নারী লাঞ্ছনার ঘটনার জন্য পুলিশের অবহেলাকে দায়ী করে। ৭ মে এই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারকে দেওয়া হয়। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দায়িত্বে অবহেলার জন্য শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে এবং চার পুলিশ কর্মকর্তাকে সতর্ক করা হয়েছে। তবে ওই ঘটনায় জড়িত কেউ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
ঘটনা পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার আগের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ করেন। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পুলিশকে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই পরামর্শ অনুসারে পুলিশ প্রশাসন দায়িত্ব পালন না করায় ওই ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনারকে ‘একেবারেই নতুন’ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনের এই মন্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার আবদুল বাতেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখনো প্রতিবেদন হাতে পাইনি। প্রতিবেদন হাতে না পেয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় পুলিশের ১৯টি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা ছিল। কিন্তু এর মাত্র একটির ফুটেজেই ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়। এতে মনে হয়, ওই সিসি ক্যামেরাগুলো কেউ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে না।
ওই দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র দুজন পুলিশ সদস্যকে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য লাঠিপেটা করতে দেখা গেছে। সন্ধ্যা সাতটার পর পুলিশের সংখ্যা বাড়ে। সাতটা ছয় মিনিটে সাদাপোশাকের এক পুলিশ সদস্য এক শ্লীলতাহানীকারীকে ধরার পরও ছেড়ে দেন। কিন্তু কাউকে আটক করা বা থানায় নেওয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মনে করে, পয়লা বৈশাখের নারী লাঞ্ছনার ঘটনা একটি ‘সংঘবদ্ধ চক্রের পরিকল্পিত কাজ’। লাঞ্ছনাকারীদের মধ্যে এ বিষয়ে আগে থেকে বোঝাপড়া ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কমিটির প্রধান সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) নাসরীন আহমাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যা বলার প্রতিবেদনেই বলে দেওয়া আছে। এর বাইরে আমাদের কোনো কথা নেই।’ এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান, শিক্ষাবিদ মাহফুজা খানম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নীলিমা আকতার ও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক আফরীন চৌধুরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দী ও অন্য প্রত্যক্ষদর্শী, প্রক্টর, রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ ও রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, একই হলের নিরাপত্তাকর্মী, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বক্তব্য এবং ৪, ৫ ও ১৬ নম্বর সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে এসব পর্যালোচনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে লিটন নন্দীসহ যাঁরা লাঞ্ছনাকারীদের প্রতিহত ও নারীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের প্রশংসা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১৩ এপ্রিল দিবাগত রাত থেকে ১৪ এপ্রিল সারা দিন ক্যাম্পাসে অবস্থান করে ওই অনুষ্ঠান মনিটরিং করেছেন প্রক্টর। তবে সন্ধ্যার আগে-পরে ঘটে যাওয়া ঘটনার গুরুত্ব তিনি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি বলে মনে হয়। এ কারণে তিনি ঘটনাস্থলে না গিয়ে প্রক্টরিয়াল মোবাইল টিম পাঠিয়েছেন, অতিরিক্ত পুলিশের ব্যবস্থা করেছেন, কিন্তু সহকারী প্রক্টরদের ডেকে আনার প্রয়োজন মনে করেননি। পরিস্থিতি শান্ত হলে রাত নয়টার পর উপাচার্যকে জানিয়েছেন।’ প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘সহকারী প্রক্টররা ওই দিন বিকেলে উপস্থিত থাকলে প্রক্টরকে এককভাবে এই ‘নিন্দনীয়’ ঘটনার জন্য দায়ী করা হতো না এবং উপাচার্যকে খবর পেয়েই অবগত করলে ঘটনা দ্রুত দমন করা যেত। তবে গণমাধ্যমের কাছে মন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রক্টরের সংযত হওয়া উচিত ছিল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এম আমজাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন না করার বিষয়টি ঠিক নয়। কেননা, আমি ঘটনা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়েছি। পুলিশ পাঠিয়েছি। উপাচার্য তখন একটি অনুষ্ঠানে ছিলেন, যে কারণে তাঁকে জানানো হয়নি। আমি আমার মুঠোফোনের কললিস্ট জমা দিয়েছি। পুলিশকে ফোন করার বিষয়টি সেখানেই রয়েছে।’
আট দফা সুপারিশ: বর্ষবরণের ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে জন্য আট দফা সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে: দোষী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে পুলিশ যাতে আরও সক্রিয় হয়, এ জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভবিষ্যতে পয়লা বৈশাখের দিন ভোর ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ থাকতে হবে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে শাহবাগ থানায় পুলিশের ‘ঝটিকা বাহিনী’ প্রস্তুত থাকতে হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, পয়লা বৈশাখের আগের দিন থেকে বাইরের দোকান বা কোনো কোম্পানি পণ্যসামগ্রীর বিজ্ঞাপনের গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে পারবে না। প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর এবং তাঁদের নির্ধারিত পোশাকের ব্যবস্থা করারও সুপারিশ করা হয়েছে।