ব্লগারদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে: অধ্যাপক অজয় রায়

আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটি বিশ্বব্যাপী বাকস্বাধীনতা ও তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে।

শুক্রবার ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে ‘স্পন্দমান ও শঙ্কামুক্ত অনলাইন ক্ষেত্র চাই’ শিরোনামে ওই ‘সনদ’ উন্মোচন করেন নিহত ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বাবা পদার্থবিজ্ঞানী অজয় রায়।

আর্টিকেল ১৯ এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক তাহমিনা রহমান বলেন, “মত প্রকাশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে ব্লগাররা সাধারণত যে সব জটিলতার মুখোমুখি হয় সেসব বিষয় বিবেচনা নিয়ে ব্লগারদের জন্য এই সনদ।

“এই সনদে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের অধিকার, তাদেরকে সহিংসতা, নির্যাতন ও হয়রানি থেকে সুরক্ষার কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।”

পাশাপাশি তথ্যসূত্র প্রকাশ করতে বাধ্য না করা এবং সরকারি সংস্থার সাথে নিবন্ধন করার ব্যাপারে বাধ্য না করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অধ্যাপক অজয় রায় ‘ব্লগারদের প্রতি সরকারের নিষ্ক্রিয় মনোভাব রয়েছে’ অভিযোগ করে বলেন, “তারা (ব্লগাররা) যে এক ধরনের মৌলবাদীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে সেটি সরকার অনুধাবন করতে পারেনি। যদি পারত, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যে তিনটি হত্যাকাণ্ড হত না।”

অভিজিতের হত্যা মামলার অগ্রগতি জানতে কিছু দিন আগে গোয়েন্দা কার্যালয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তারা বলছে, তারা দুজনকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তবে এখনও ধরতে পারেনি।”

ব্লগারদের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অজয় রায় বলেন, “ধরে নিলাম ব্লগাররা নাস্তিক, সেটি যদি অপরাধ হয় তাহলে তাদের বিচারের সম্মুখীন করুক। যদি আদালত তাদের ফাঁসির রায় দেয় তাহলে ফাঁসিতে লটকাবে, কেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সরকার প্রশ্রয় দেবে?”

ব্লগারদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে বলেও জোর দিয়ে বলেন তিনি।

“অভিজিতের হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোন করে বলেছিলেন, আপনার জন্য কী করতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ, তিনি সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ খবরটি তিনি মিডিয়াতে দেননি অর্থাৎ ব্লগারদের প্রতি তার কিছু না কিছু সহানুভূতি প্রকাশ পাক সেটিও বোধহয় তিনি জনগণকে জানাতে চাননি।”

“ব্লগারদের প্রতি সরকারের নিষ্ক্রিয় মনোভাব রয়েছে, তারা বিচার চান না সেটা আমি বলবো না। কিন্তু এটি নিয়ে তাদের একটা খুব আহামরি অভিযোগ নেই।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের মন্তব্যেরও সমালোচনা করেন এই অধ্যাপক।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যে কথা বলেছেন তার কোন প্রয়োজন ছিল না। তোমার এ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর কোন দরকার ছিল না। সে উটকো মন্তব্য করে বলেছে, অভিজিৎ একজন স্বঘোষিত নাস্তিক, আওয়ামী লীগ এ ধরনের রাজনীতি করে না। তোমার এই অর্বাচিন উক্তিটার দরকার কী ছিল?”

“এদিক থেকে দেখে মনে হয় ব্লগারদের প্রতি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের হত্যাকারীদের ধরার ব্যাপারে উৎসাহ নেই, এমনকি ব্লগার হত্যার বিষয়ে সরকারের ঘৃণা বা প্রতিবাদও নেই।”

ঢাকায় স্বামীর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে রাফিদা আহমেদ বন্যার মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জয় বলেছিলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এতটাই নাজুক যে প্রকাশ্যে তার কিছু বলা স্পর্শকাতর ছিল, তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে অভিজিতের বাবাকে সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন।

অভিজিৎকে ‘ঘোষিত নাস্তিক’ উল্লেখ করার পর রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে জয়কে উদ্ধৃত করে বলা হয়, “আমরা (আওয়ামী লীগ) নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। তবে এতে আমাদের মূল আদর্শের কোনো বিচ্যুতি হবে না। আমরা ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।”

যে সনদ তৈরি করা হয়েছে তা ব্লগারদের সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করবে এবং এই সনদ সরকার আমলে নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন অভিজিতের বাবা অজয় রায়।

ব্লগারদের উদ্দেশে অজয় রায় বলেন, “এমন কিছু ‍লিখবেন না যা জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আপনারা এই সনদ ছাড়াও নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণ করুন, আপনারা মত প্রকাশ করতে যেয়ে এমন কাজ করবে না যা অন্যর চেতনা বা ধর্মীয় বা অন্য যে চেনতাই হোক তাতে নিরর্থক আঘাত হানে।”

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের রাজনৈতিক শাখার প্রধান আদ্রিয়ান জোনস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ব্লগের মডারেটর আইরিন সুলতানা, ব্লগার ফাতিমা আবেদিন নাজলা, কবি নীল সাধু ও নাসরিন সুমি।

এছাড়া অনুষ্ঠানে শতাধিক ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, ব্লগ সঞ্চালকরা উপস্থিত ছিলেন।

১২ সুপারিশ

আর্টিকেল ১৯ এর ১২টি ধারার মধ্যে অন্যতম অনলাইনে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তজার্তিক আইনের যথাযথ অনুসরণ নিশ্চিত করা। অনলাইন মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর যে কোন বিধি-নিষেধ আরোপের ক্ষেত্র্রে আন্তজার্তিক মানদণ্ড অনুসরণের সুপারিশ এসেছে সনদে।

এছাড়া ব্লগে লেখালেখির কারণে ব্লগারদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনের হয়রানিমূলক অপপ্রয়োগ বন্ধ করা, তাদের উপর আক্রমণ ও সহিংসতাকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর প্রত্যক্ষ আঘাত হিসেবে বিবেচনা করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

অন্যদিকে বিদ্যমান আইনে পেশাদার সাংবাদিকরা যে ধরনের সুরক্ষা বা সুবিধা পেয়ে থাকেন, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের কাজে নিয়োজিত ব্লগারদের জন্যও একই ধরনের সুরক্ষা ও সুবিধাদি নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করে আর্টিকেল ১৯।

পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি ব্লগারদের জন্যও প্রবেশাধিকার সম্পর্কিত সরকারি স্বীকৃতিব্যবস্থা উম্মুক্ত করা, সাংবাদিকতাধর্মী কাজে নিয়োজিত ব্লগারদের পেশাদার সাংবাদিকদের মতই তথ্যসূত্রের সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, তথ্যসূত্র প্রকাশের যে কোন অনুরোধ বা নির্দেশ শুধু গুরুতর ঘটনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে সনদে।

তবে এক্ষেত্রে প্রথমে আদালতের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

আর্টিকেল ১৯ বলছে, ব্লগারদের কখনোই সরকার বা সরকারি সংস্থার কাছে নিবন্ধিত হতে বাধ্য করা যবে না।

ব্লগে লেখালেখির জন্য ব্লগারদেরকে তাদের প্রকৃত নামে নিবন্ধিত হতে বাধ্য করা যাবে না।

এছাড়া প্রচলিত ধারার গণমাধ্যম কর্তৃক প্রণীত আচরণ বিধি মেনে চলতে ব্লগারদের বাধ্য না করার সুপারিশও এসেছে সনদে।

১৯৮৭ সাল থেকে তথ্য অধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করছে লন্ডন ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল ১৯। ‘মানবাধিকার সনদের’ ১৯ ধারা থেকে সংগঠনটি তাদের নাম নিয়েছে।